Tuesday, November 26, 2019

হিন্দু ভোট যত কনসলিডেট হবে, হিন্দু তোষণের প্রতিযোগিতা তত বাড়বে

যেদিন রামমন্দির ইস্যু প্রথমবার সকলের সামনে এসেছিলো, সেই দিনটাতেই বোধহয় ভারতের রাজনীতির হিন্দুকরণের সূত্রপাত হয়েছিল বলে ধরা যায়। হিন্দুদের কোনও দাবি নিয়ে যে রাজনীতি হতে পারে, এর আগে এটা অবাস্তব বলে মনে হত সবার। কিন্তু ভারতের রাজনীতিকে ধর্মের ভিত্তিতে দ্বিখন্ডিত করে দিল এই ইস্যু। ভারতের রাজনীতিতে আগে ছিল শুধুই মুসলিম পক্ষ। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের পাখির চোখ ছিল মুসলিম ভোট। রামজন্মভূমি আন্দোলন থেকে শুরু হল হিন্দুর রাজনৈতিক কনসলিডেশন। হিন্দুরা এবার একটা পক্ষ হল। তাদের একটা আত্মবিশ্বাস জন্মালো - যে হিন্দুরা বাবরি মসজিদকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, তাদের অসাধ্য আর কী থাকতে পারে! এই আত্মবিশ্বাস থেকেই তৈরি হল হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক আর এই ভোটব্যাঙ্ককে পাখির চোখ করল বিজেপি। বিজেপির উত্থান এই হিন্দু ভোটের উপরে ভিত্তি করেই। রামজন্মভূমি আন্দোলন‌ই বিজেপিকে ভারতের রাজনীতিতে এসকেপ্ ভেলসিটির ইন্ধন যোগালো।

যদিও ভারতের রাজনীতির গতি প্রকৃতি আগেও হিন্দুরাই নির্ধারণ করতো, কিন্তু এই বোধ হিন্দুদের এর আগে ছিল না। একটা মিথ্যা ন্যারেটিভ সুন্দর ভাবে পরিবেশন করা হত - মুসলিম ব্লকভোট‌ই ভারতের রাজনীতির ভাগ্যনিয়ন্তা। আর এই মিথ্যাকে ছন্নছাড়া হিন্দুরা বিশ্বাস করতো মনেপ্রাণে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্বের অধিকাংশ এখনও এই বিশ্বাস নিয়েই রাজনীতি করে যে মুসলিম ভোট না পেলে এরাজ্যে ক্ষমতা দখল করা সম্ভব নয়। তাদের এই ধারণার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। 

বিশ্ববাসীর ভুল ভাঙলো ২০১৪ সালের সেই দিনটাতে, যেদিন গুজরাটের গোধরায় হিন্দু হত্যার দৃষ্টান্তমূলক প্রতিশোধের নায়করূপে অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হলেন। এই জয় বাস্তবে বিজেপির জয় ছিল না, এই জয় ছিল দীর্ঘদিনের পরাজয়ের গ্লানি বুকে চেপে রাখা, নিজের দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের ব্যবহার পেয় লাঞ্ছিত, অপমানিত হতে থাকা হিন্দুদের বহু আকাঙ্খিত জয়। হিন্দুরা মোদিজীর অভিষেক চেয়েছিল, তাই মোদিজী সিংহাসনে বসেছিলেন। তাই আমরা দেখলাম উন্নয়নের জোয়ার ব‌ইয়ে দেওয়া স্বপ্নের নায়ক উদারচতা বাজপেয়ীজীর ফিলগুডের সরকার পরাজিত হলেও ২০১৪-তে ব্যাপক জনসমর্থন পেলো মুসলমানের রক্তে হোলি খেলার তকমাধারী নরেন্দ্র মোদির সরকার। 

২০১৪ র নির্বাচনের ফলাফল হিন্দুদের আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল এবং মোদিজীও এই পাল্স বুঝে নিয়েছিলেন সঠিকভাবেই। তাই পাকিস্তানে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, তিন তালাক নিষেধ, বারাণসীর তীরে গঙ্গারতি, সৌদি আরবে মন্দির নির্মাণ, নাগরিকত্ব বিল লোকসভায় পাশ করানো মোদি সরকার ২০১৯-এ হল আরও অনেক বেশি শক্তিশালী। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি এই সরকারকে। নিয়ে চলেছে একের পর এক কঠোর এবং সাহসী সিদ্ধান্ত - ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি, রামমন্দির তৈরির পথ প্রশস্ত করার পথ ধরে আবার আসছে নাগরিকত্ব বিল এবং তারপরে এন‌আরসি। দ্বর্থ্যহীন ভাষায় সরকারের সাহসী ঘোষণা - বহিরাগত হিন্দুরা শরণার্থী আর মুসলমানরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী! দেশটা হিন্দুরাষ্ট্র হতে আর বাকি র‌ইলো কী!

সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলো হিন্দুদের প্রতি ন্যায় বিচার তো অবশ্যই, কিন্তু যদি রাজনীতির পরিভাষায় কেউ একে 'হিন্দু তোষণ' বলে, সে কি বিরাট ভুল করে ফেলবে? কেউ যদি বলে বিজেপির এই 'হিন্দু তোষণ' বিরোধী দলগুলোর মুসলিম তোষণের পাল্টা রাজনৈতিক চাল, সেও কি খুব ভুল বলবে? দেশের ৮০% ভোটারকে কনফিডেন্সে নিয়ে রাজনীতি করাটাই তো স্বাভাবিক। তবে এটা এতদিন কোনও পার্টি করেনি কেন? কারণ এতদিন হিন্দুরা তাদের ভোটের মূল্য এবং ক্ষমতা বোঝে নি। মুসলমানরা বরাবর মুসলমান হিসেবে ভোট দিয়েছে, হিন্দুরা ভোট দিয়েছে নিজের নিজের পছন্দের পার্টির একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে। সেকুলার ভারতে হিন্দু হিসেবে ভোট দেওয়া যায়, এবং সেই ভোটে সরকার গড়া যায় একথা বাবরি ধ্বংসের আগে হিন্দুরা কোনদিন ভাবতেই পারেনি। সেই ঘটনার পরে কিন্তু হিন্দুদের মনে নিজেদের দেশ নিজেরা শাসন করার একটা আকাঙ্খার জন্ম নিয়েছে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। তাই এই 'হিন্দু তোষণ' অথবা হিন্দুত্ব কেন্দ্রিক রাজনীতি বর্তমান সেকুলার ভারতে সম্ভব হয়েছে কোনও রাজনৈতিক দল অথবা নেতার বদান্যতায় নয়, এটা সম্ভব হয়েছে হিন্দু তার শক্তি সম্পর্কে অবহিত হয়েছে বলে, বিশেষতঃ সে তার ভোটের মূল্য এবং ক্ষমতা - দুটোই বুঝতে পেরেছে বলে।

একদিকে হিন্দু তার ভোটের মূল্য বুঝতে পেরেছে। অপরদিকে মোদি-শাহ'র বিজেপিও হিন্দুদের ভোটের মূল্য কিছুটা হলেও দিয়েছে। প্রতিদানে হিন্দুরাও তাদের বিমুখ করে নি। পরিণামে আজ হিন্দু ব্লকভোট‌ আর বিজেপির সাপোর্ট বেস সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলস্বরূপ কোনঠাসা হয়েছে সেকুলারিজমের নামে মুসলিম তোষণকারী প্রত্যেকটা দল। চাপে পড়ে এখন অনেকের মাথা থেকে ফেজটুপি সরে যাচ্ছে, নেমে যাচ্ছে নীলসাদা হিজাব। সম্প্রতি আমাদের রাজ্যে উদ্বাস্তুদের জন্য জমির পাট্টা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। খুব সম্ভব রাজ্য সরকারের দৃষ্টিতে হিন্দুরাই উদ্বাস্তু। যদি তা ই হয়, তাহলে কি এবার এই রাজ্যেও 'হিন্দু তোষণ' পর্ব শুরু হতে চলেছে? অসম্ভব কিছু নয়।

১৫-২০% বাম ভোটের সাথে গোটা ১৫% মুসলিম ভোট তৃণমূলের থেকে বেরিয়ে গিয়ে জোট বাঁধার যে ভয় দেখিয়ে রাজ্যের মুসলমানরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্ল্যাকমেল করছিল, বামেদের ভোট কমে গিয়ে ৭% এ ঠেকায় এখন সেটা আর করা সম্ভব হচ্ছে না। সুতরাং মমতা ব্যানার্জির মুসলিম তোষণের কম্পালশন আর বিশেষ নেই। তাই এখন ওয়েসি-র মিম পার্টিকে এনে তৃণমূলের মুসলিম ভোট কাটার ভয় দেখিয়ে মমতাকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছে মুসলমানেরা। কিন্তু মুসলমানরা কি তৃণমূলের ভোট কেটে বিজেপির সুবিধা করে দিতে চাইবে? তারা এটা করবে বলে আমার মনে হয় না। তাহলে নিজেদের বাঁচার তাগিদে তৃণমূলকে বাঁচিয়ে রাখার কম্পালশন এখন কাদের? মমতা ব্যানার্জি এখন মুসলমানদের কেবল বিজেপির জুজু দেখিয়েই শান্ত করে রাখবেন। আমি বিশ্বাস করি মমতা ব্যানার্জি যা করেন, নিজে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই করেন।

এদিকে মিমের প্রচারে যে হিন্দু কনসলিডেশন তৈরি হবে, তাকে ভাঙার জন্য মমতা ব্যানার্জিকে হিন্দুর জন্য হাত খুলতেই হবে। ইতিমধ্যেই তার কিছু কিছু ইঙ্গিত‌ও পাওয়া যাচ্ছে। মাথার হিজাব তো নেমে গেছেই, সাথে সাথে পূজার ভোগ রান্না করার ভিডিও বের করা হচ্ছে। উদ্বাস্তুদের জন্য জমির পাট্টা দেওয়ার ঘোষণাও অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। তবে নাগরিকত্ব বিল পাশ হলে মমতার উপরে চাপ আরও বাড়বে। আমার ধারণা তৃণমূল উদ্বাস্তু হিন্দুদের ভোটের কথা মাথায় রেখে এই নাগরিকত্ব বিল পাশ করাতে পরোক্ষভাবে কেন্দ্রীয় সরকারকে সহযোগিতাই করবে। 

হিন্দু ভোট যত কনসলিডেট হবে, হিন্দু তোষণের প্রতিযোগিতা তত বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে লাখ টাকার প্রশ্ন থেকেই গেল - রাজ্যের রাজনীতিতে ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হতে থাকা মুসলিম ভোটের লোভে পড়ে রাজ্য বিজেপি নিজেদের পায়ে, সাথে সাথে পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালী হিন্দুর পায়ে কুড়াল মারবে না তো? বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব এই সংগঠিত হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে taken for granted মনে করছে না তো!

Thursday, November 21, 2019

মেরুদণ্ডহীনতায় লজ্জিত হ‌ওয়ায় লজ্জা কিসের?

আজকের দিন, ২২শে নভেম্বর। সালটা ২০০৭। কলকাতার বুকে লুঙ্গি-টুপির তাণ্ডব চলছে। তসলিমাকে তাড়াতে হবে এই রাজ্য থেকে। কেন? উনি একটা ব‌ই লিখেছেন। নাম 'লজ্জা'। সেই ব‌ইয়ে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের একটা চিত্র তুলে ধরেছেন সাহসী তসলিমা। বাংলাদেশে প্রাণ সংশয়। তাই আশ্রয় নিয়েছেন প্রোগ্রেসিভ, লিবেরাল বাঙালির বাসস্থান এই কলকাতায়। হ্যাঁ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, কবি সৃজাত, শীর্ষেন্দু, গরুখেকো সুবোধ-বিকাশ কবীর সুমনদের কলকাতায়।

লুঙ্গি-টুপির তাণ্ডব চলছে তসলিমাকে তাড়াতে হবে। দুদিন ধরে বিনা বাধায়। নেতৃত্বে জনপ্রতিনিধি ইদ্রিস আলী। না, এর প্রতিবাদে একটাও মিছিল, যার সামনের সারিতে অপর্ণা সেন, সুবোধ বিকাশ - এই কলকাতার বুকে হয় নি। একটাও কবিতা সৃজাতদের কলম থেকে বেরোয় নি। দুদিন ধরে চলল এই তাণ্ডব। অবশেষে সকলের অসহায় আত্মসমর্পণ মুসলিম মৌলবাদের সামনে। তাড়ানো হল তসলিমাকে।

বুদ্ধিজীবীদের এই নীরবতা কি কলকাতার বাঙালির লজ্জা নয়? মরীচঝাঁপির ক্ষেত্রে আনকম্প্রোমাইজিং অবস্থান নেওয়া প্রবল প্রতাপশালী লাল সরকারের মুসলিম মৌলবাদীদের সামনে এই অসহায় আত্মসমর্পণ কি বামপন্থীদের লজ্জা নয়? 

না, এগুলো ওদের লজ্জিত করে না। কারণ এই পক্ষপাতমূলক আচরণটাই ওদের নীতি। কারণ এরা ওদের পক্ষে। মুক্তচিন্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা - এইসব তত্ত্বের অবতারণা তখনই হবে যখন আপনি এই মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। এই সব তত্ত্ব বামৈস্লামিক দুষ্কৃতীদের প্রতিক্রিয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অন্যতম অস্ত্র। এই সব‌ই আপনাকে আমাকে থামানোর জন্য।

এটা আসলে আমাদের‌ই লজ্জা। কারণ আমরা এই বামৈস্লামিক ষড়যন্ত্রের হাত থেকে তসলিমাকে বাঁচাতে পারিনি। কারণ আমরা আজও এই ভারতবিরোধী, হিন্দুবিরোধী বামৈস্লামিক শক্তিকে ভারতের মাটি থেকে শিকড়সমেত উপড়ে ফেলতে পারিনি। তাই যতদিন বামৈস্লামিক দুষ্কৃতীদের শিকার তসলিমাদের নিরাপত্তা দিতে না পারবেন, এদের ধ্বংস করে প্রকৃত মুক্তচিন্তার প্রতিষ্ঠা না করতে পারবেন, আসুন লজ্জিত হ‌ই। মেরুদণ্ডহীনতায় লজ্জিত হ‌ওয়ায় লজ্জা কিসের?

Sunday, October 6, 2019

বাঙালির থিম পূজো

বাঙালির উর্বর মস্তিষ্কের আবিষ্কারে দুর্গাপূজা হয়েছে 'থিম পূজো'। যে সমস্ত থিম দেখতে পাচ্ছি, তার বেশিরভাগ‌ই সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে দুর্গাপূজার প্রেক্ষাপটের সাথে সম্পর্কবিহীন বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপিত করে গর্বের সাথে বলা হচ্ছে - এবার আমাদের থিমপূজা হচ্ছে। এই থিম আগে স্থান পেতো মন্ডপের বাইরে, বিশেষত আলোকসজ্জায়। এখন মূল মন্ডপ এমনকি দুর্গামূর্তিও এই থিমের কবলে। আমরাও দেখতে যাচ্ছি, নতুন জামাকাপড় পরে, রাত জেগে!

থিমপূজার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল বার্তাটা আমরা ধরতে পারছি না। সেটা হল - ধীরে ধীরে দুর্গাপূজার ধর্মীয় আঙ্গিককে গুরুত্বহীন করা হচ্ছে, বাঙালিকে ধর্মহীন করা হচ্ছে। দুর্গাপূজা থেকে দুর্গাপূজা বিহীন থিমপূজার একটা ট্রানজিটে আমরা অবস্থান করছি। এরপর হয়তো খালি প্রতীক হিসেবে ঘটপূজা হবে, মন্ডপসজ্জা এবং মূর্তিতে থিমের মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে 'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার' গোছের কিছু সুচিন্তিত ন্যারেটিভ। তারপরের ধাপে শুধুই থিম, পূজা বাদ। প্রতিমা নিরঞ্জন উপলক্ষ্যে শোভাযাত্রা নয়, হবে কার্নিভাল, পাশ্চাত্যের অনুকরণে বড় বড় ছাতা থাকবে, ট্যাবলো থাকবে, থাকবে চোখ ধাঁধানো বিভিন্ন উপকরণ। মা দুর্গার প্রতিমা থাকবে না সেখানে। আগেই চুপেচাপে ঘট বিসর্জন হয়ে যাবে সবার অলক্ষ্যে! আমরা ধন্য হবো - আহা কী দেখিলাম, জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিবো না!

দিন আসছে, হয়তো বিয়ের অনুষ্ঠানে থাকবে অন্নপ্রাসনের থিম, আর অন্নপ্রাসনের অনুষ্ঠানে শ্রাদ্ধের থিম। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা দুহাত তুলে বলবে, সাধু সাধু! কী ব্যতিক্রমী প্রয়াস! হোয়াট বেঙ্গল থিংক্স টুডে, ইন্ডিয়া থিংক্স টুমরো!

আজকে গোটা দুনিয়ার বুঝতে পারছে, আমরা, বাঙালিরা যা করে চলেছি তা উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় নয়, এটা একটা দেউলিয়া মানসিকতা, চূড়ান্ত অগভীর চিন্তাশক্তির প্রতিফলন।

বাঙালি তো বুদ্ধিবৃত্তিতে এরকম দীনহীন কখন‌ও ছিল না!!

দরকার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি

আমাদের কোনও কিছুকে আংশিক ভাবে দেখার পরিবর্তে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। ব্যক্তি হোক, বস্তু হোক, ঘটনা হোক অথবা পরিস্থিতি হোক অথবা মতাদর্শ হোক; সার্বিকভাবে তার প্রভাব (impact), পরিনাম (consequences) অথবা উপযোগিতা (utility) বিচার করে তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হ‌ওয়া দরকার।

মনে করুন একটা পিল, যাতে একটু পটাশিয়াম সায়ানাইড যার উপরে সুগার কোটিং দেওয়া আছে। কেউ বলবে ওটা মিষ্টি, কেউ বলবে ওটা বিষ। দুটোই সত্য। বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু ওটা খেলে তার পরিনাম কী হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন মানুষ সার্বিক পরিনামের কথা ভেবেই স্থির করবে ওই পিল খাবে কি খাবে না। যে মরতে চায় সে খাবে, আর যে বেঁচে থাকতে চায় সে খাবে না। কিন্তু যারা বক্তব্যের সত্যাসত্য নিয়ে শুধু লম্বা বিতর্ক‌ই করতে থাকবে, তাদের এই বিতর্কের মূল্য কি? তারা একবার বলবে পিলটা খুব মিষ্টি, আবার পরক্ষণেই বলবে পিলটা খুব বিষাক্ত। দুটোই সত্য হলেও এদের এই বিতর্ক কাউকে পথ দেখাবে না, শুধু বিভ্রান্ত‌ই করতে থাকবে। আপনাকে সার্বিক পরিনতির কথা ভেবেই একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কি করবেন।

একটা মতাদর্শের ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। কতটা ঠিক, কতটা ভুল সেটা বিচার্য্য নয়। বিচার্য্য বিষয় হল এই মতাদর্শের সার্বিক পরিনাম দেশ ও জাতির উপরে কি হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলছি, গান্ধীর আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাস, গোরক্ষায় আগ্রহ, অনারম্বর জীবনযাপন, রামরাজ্যের কল্পনা ইত্যাদি (সেগুলো ভন্ডামি না সত্য সে বিচারে যাচ্ছি না) দেখে আপনি তার প্রশংসা করতেই পারেন। পাশাপাশি ইসলামের বিষয়ে তার চূড়ান্ত সমঝোতার নীতি, অনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ইত্যাদি দেখে আপনি তার সমালোচনাও করতে পারেন। কিন্তু সার্বিক বিচারে আপনাকে স্থির করতে হবে, গান্ধীর নেতৃত্বে দেশ ও সমাজ নিরাপদ  ছিল কি না। হয়তো গান্ধীর অনেক কিছুই অনেকের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় থাকতে পারে। কিন্তু আজ প্রমাণিত যে টোটাল 'গান্ধী প্যাকেজ' দেশের এবং হিন্দুদের যে সর্বনাশ করেছে তা অপূরণীয়। 

আজও অনেকেই অনেক ন্যারেটিভ সামনে আনছেন বা এনেছেন। তার কতটা গ্রহণযোগ্য, কতটা নয় - এর পারসেন্টেজের হিসাব করে সেই ন্যারেটিভকে অনুসরণ করার পরিবর্তে দেশ ও জাতির ভবিষ্যত নির্মাণে এদের টোটাল প্যাকেজের (ন্যারেটিভ, কার্যপদ্ধতি, নেতৃত্ব, কমিটমেন্ট ইত্যাদি) সার্বিক প্রভাব ও উপযোগিতা কতটা, সেটা ভেবেই সেই প্যাকেজের মূল্যায়ন করা উচিত। মূল্যায়ন করুন, সিদ্ধান্ত নিন, নিজেকে নিয়োজিত করুন। এদিক ওদিক হাতড়ে বেরিয়ে সময় নষ্ট করবেন না। সময় আমাদের হাতে খুবই কম।

দুর্গাপূজা এখন শারদোৎসব

প্রথমে হলো দুর্গাপূজা থেকে দুর্গোৎসব। তাতে খুব একটা অসুবিধা নেই। কারণ বাঙালির উৎসব আর পূজাকে আলাদা করা যায় না। প্রায় সব উৎসবেই পূজার ছোঁয়া লেগে থাকে। দোল, মকর সংক্রান্তি, চৈত্র সংক্রান্তি, নববর্ষ - সবেতেই পূজার একটা অংশ আছে।

কিন্তু এরপর দুর্গোৎসব হয়ে গেল শারদোৎসব। পূজা বাদ হয়ে যাওয়ার পরে দুর্গাও বাদ। পড়ে র‌ইলো শুধু উৎসব, যেটা শরৎকালে হয় বলে শারদোৎসব।

এরপরে এলো নতুন ন্যারেটিভ - ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। প্রতিমা নিরঞ্জন বাদ গেল, এলো কার্নিভাল। পূজা উদ্বোধনে রাজনৈতিক নেতা নেত্রীর ভীড়। সেখানেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। বিধায়ক সেনবাবুর সাথে পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য জনাব হায়দার আলীকে থাকতেই হবে! লেটেস্ট ট্রেন্ড হল হিন্দু মহিলা নেত্রীর হিজাব পরে পূজা উদ্বোধন! মূর্তিমতি সেকুলারিজম(অবশ্য সেকুলারিজম কোন লিঙ্গের তা জানা নেই)!

এখন চলছে থিমের বোলবালা। অস্ত্রহীনা দুর্গামূর্তি! আজান মুখরিত মন্ডপ! বাঙালির দূর্গাপূজা থেকে আজান মুখরিত মন্ডপের এই যাত্রা আসলে একটা দীর্ঘকালীন পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন। এই পরিকল্পনা হল ধীরে ধীরে বাঙালিকে তার চিরন্তন শক্তির উপাসনা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা। এর সাথে বাঙালিয়ানার মধ্যে আরবের মরু সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ। বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় কেড়ে নিয়ে এই জাতিকে একটা আত্মপরিচয়বিহীন জনতার ভীড়ে রূপান্তরিত করার ষড়যন্ত্রের শিকড় আজ অনেক গভীরে পৌঁছে গিয়েছে। পচন শুরু হয়েছে মাথা থেকেই। এই যাত্রাপথ শেষ হচ্ছে বাঙালির সম্পূর্ণ ইসলামীকরণে। এই যাত্রা আসলেই বাঙালির অন্তর্জলি যাত্রা। এই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বাঙালি জাতিকে স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোর দায়িত্ব আজকের বাঙালি যুবসমাজকেই নিতে হবে।

গান্ধী একটা প্যাকেজ, বিষের থলি

'গান্ধী' একটা কমপ্লিট প্যাকেজ(বিষের থলি), আপোষ মীমাংসার জন্য জাতির স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়ার নীতিই যার মূল। এই প্যাকেজের 'এই অংশটা ভালো' কিংবা 'ওই অংশটা খারাপ' এটা হয়না। তবুও হঠাৎ 'গান্ধী' কে গ্লোরিফাই করার একটা ট্রেন্ড নতুন করে শুরু হয়েছে। এর পরিণতি ভয়ংকর হবে। হিন্দুকে বাঁচতে হলে 'গান্ধীত্ব(😊)'-র  ঠিক বিপরীত পথে হাটতে হবে।

'গান্ধীর পথে চললে পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান হতে পারে' - খবরের কাগজে হেডলাইন। বক্তা নাকি আমাদের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যদি সত্যি হয় তাহলে তাঁকে অনুরোধ করবো, জাতিকে নতুন করে বিভ্রান্ত করবেন না। 'গান্ধীর পথ'-এর পরিণাম দেশভাগ, হিন্দুদের গণহত্যা, হিন্দু নারীদের গণধর্ষণ, আমাদের উদ্বাস্তু হ‌ওয়া। এই পথের ফলশ্রুতি হল জাতীয় বিপর্যয়। আমরা এই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি চাই না।

যে মুখে রামধুন, সেই মুখেই অন্যায়ের সাথে আপোষ করার পরামর্শ - এই ভন্ডামিকে গ্লোরিফাই করলে গোটা জাতিটাই ভন্ড(যেটুকু বাকি আছে) হয়ে যাবে। মোদিজীকে অনুরোধ, এই উপকারটুকু করবেন না। গান্ধী আজ অপ্রাসঙ্গিক। ওকে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তুলবেন না।

নবরাত্রি পালন, মহিষাসুর মর্দিনী মা দু্র্গার উপাসনা আর গান্ধীভজনা একসাথে চলতে পারে না। এদুটো পরস্পরবিরোধী। যারা এটা করবেন, তাদের চেয়ে বড় ভন্ড এই দুনিয়ায় আর নেই।

Monday, September 30, 2019

পশ্চিমবঙ্গের ভূমিপুত্র এবং তাদের অধিকার

পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালি হিন্দুরা, যারা ভারতের মাটিকে মাতৃসম মনে করেন, তারাই পশ্চিমবঙ্গের ভূমিপুত্র।

পশ্চিমবঙ্গের বাইরে, ভারতের অন্য রাজ্য কিংবা পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে বসবাসরত একজন বাঙালি হিন্দু এরাজ্যে ফিরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাইলে তিনি সর্বদা স্বাগত এবং ভূমিপুত্রের মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী।

২০শে জুন ১৯৪৭-এ বঙ্গীয় আইন পরিষদের ভোটাভুটিতে একজন মুসলমান‌ও পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে ভোট দেয় নি। সবাই চেয়েছিল সম্পূর্ণ বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাক।

এমনকি ১৯৪৬ এর সাধারণ নির্বাচন, যাতে মুসলিম লীগের মূল ইস্যু ছিল পাকিস্তান, সেই নির্বাচনে বাংলার মুসলমানেরা উজাড় করে লীগকে ভোট দিয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় সব মুসলমান চেয়েছিল যে সম্পূর্ণ বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হোক। তাদের সমর্থনের ফলেই এই নির্বাচনে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত সিটের ৯৫% লীগের পক্ষে যায়।

ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত বঙ্গের এক তৃতীয়াংশ ভুমি এই পশ্চিমবঙ্গ যে হিন্দুদের হোমল্যান্ড এবং বাঙালি হিন্দুরা যে এখানকার ভূমিপুত্র সে বিষয়ে এরপরেও কোনও সন্দেহ আছে?

ভারত উপমহাদেশে যে সংস্কৃতির জন্ম এবং ক্রমবিকাশ হয়েছে, তার অন্যতম মূল তত্ত্ব হল Live and let live. বহিরাগত আব্রাহামিক ভাবধারার মূলতত্ত্ব এই মাটিতে বিকশিত Live and let live সংস্কৃতির পরিপন্থী। তাই এই অসহিষ্ণু আব্রাহামিক ভাবধারায় যারা বিশ্বাস করে, তারা কিভাবে এই মাটির ভূমিপুত্র হতে পারে?

কেউ ভারতের নাগরিক হলেই কিন্তু সে এরাজ্যের ভূমিপুত্র হতে পারে না। ভূমিপুত্র একটা বিশেষ 'স্টেটাস'। সবাই ভারতের নাগরিক হলেও, ভারতের একতা ও অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও বিহারে একজন বিহারীর যে স্টেটাস, মহারাষ্ট্রে মারাঠির যে স্টেটাস, তামিলনাড়ুতে একজন তামিলের যে স্টেটাস, গুজরাটে একজন গুজরাটির যে স্টেটাস, আসামে একজন অহমীয়ার যে স্টেটাস, নাগাল্যান্ডে একজন নাগার যে স্টেটাস, পশ্চিমবঙ্গে একজন হিন্দু বাঙালির সেই একই স্টেটাস প্রাপ্য। এই অধিকার থেকে কেউ আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না।

পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত তফশিলি উপজাতির অন্তর্ভুক্ত বন্ধুরাও এখানকার ভূমিপুত্র বলে আমি মনে করি।

এছাড়াও যে সমস্ত অবাঙালি হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈনদের জন্ম পশ্চিমবঙ্গে অথবা দীর্ঘ  সময় ধরে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, তাদের মধ্যে যারা নিজেদের আইডেন্টিটি বজায় রেখেও এখানকার ভূমিপুত্র হিন্দু বাঙালি সমাজ, আদিবাসী সমাজ এবং তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল; তারা চাইলে তাদের সাথে এই ভূমিপুত্রের স্টেটাস ভাগাভাগি করে নিতে আমাদের কোনও আপত্তি থাকা উচিত নয় বলে আমি মনে করি।

মনে রাখতে হবে, ভারতের দশটা রাজ্যকে এবং রাজ্যের ভূমিপুত্রদের ৩৭১ ধারার মাধ্যমে বিশেষ স্টেটাস দেওয়া হয়েছে। আন্দামান এবং নিকোবর দীপপুঞ্জের ভূমিপুত্রদের 'আইল্যান্ডার কার্ড' এর মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাই এই ভূমিপুত্রের লীগ্যাল স্টেটাসের কল্পনা মোটেই অলীক নয়। এর বাস্তবায়ন সম্ভব কিন্তু তার জন্য অনেক মূল্য দিতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের এই বাঙালি হিন্দু জাতীয়চেতনা কি বৃহত্তর হিন্দু অবধারণার পরিপন্থী?

আপনি আর আমি যখন এক জায়গায় আসি তখন কি নিজের ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে এক জায়গায় আসতে হয়? কয়েকজন ব্যক্তি নিয়ে যখন একটা পরিবার তৈরি হয়, তখন সেই পরিবারের সব ব্যক্তিকে তাদের ব্যক্তিসত্ত্বাকে বিসর্জন দিতে হয়? বরং যে ব‍্যক্তি বেশী প্রতিষ্ঠা অর্জন করে, পরিবারে তার গুরুত্ব বেশী থাকে, সে একজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে আলাদা সম্মান পায়। তাহলে বৃহত্তর হিন্দু সমাজের অঙ্গ হতে হলে, সেখানে ভ্যালু অ্যাড করতে হলে বাঙালিকে তার জাতীয় পরিচয় বিলোপ করতে হবে কেন? কেন আমরা বৃহত্তর হিন্দু সমাজের গুরুত্বপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে বাঙালি সমাজকে তৈরি করবো না? বাঙালির মাটি গেছে, মানুষ গেছে, আত্মসম্মান তলানিতে। সরকার এন‌আরসি আর ক‍্যাব করে দিলেই আমরা সন্তুষ্ট! এটাও যে আমাদের ডিমান্ডের জন্য হচ্ছে তাও তো নয়! অহমীয়া আন্দোলনের চাপে এই এন‌আরসি। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দু ফোর্জ ডকুমেন্ট তৈরি করিয়ে লুকিয়ে ভারতে থাকা পছন্দ করেছে, কিন্তু নিজদের নাগরিকত্বের দাবিতে মরণপণ আন্দোলন করেনি। এই অচেতন, পরনির্ভরশীল জাতিকে আত্মনির্ভর এবং স্বাভিমান সম্পন্ন হতে হলে নিজের জাতীয়চেতনাকে জাগাতেই হবে।

।।এ মাটি আমার মাটি, মাটির দখল ছাড়ছি না।।