Sunday, May 3, 2020

হিন্দু সংহতির লক্ষ্য কি? (২)

আগের পর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, আমাদের এই পুণ্য বঙ্গভূমি এবং এই ভূমিতে জন্ম নেওয়া সনাতন জীবনদর্শনকে রক্ষা করাই হিন্দু সংহতির কাজ। কারণ এই সনাতন জীবনদর্শন মানব কল্যাণকারী। এই জীবনদর্শনই সমগ্র সৃষ্টিকে বিনাশের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

সনাতনী জীবনদর্শনের আধার হল এই মাটি এবং এই মাটির সন্তানদের নিয়ে গঠিত সমাজ। এই মাটিতে আমরা জন্ম নিয়েছি। এই মাটির কোলেই আমরা লালিত পালিত হয়েছি। এই ভূমির জল-বায়ু-আকাশ আমাদের পোষণ করেছে। তাই এই ভূমির সাথে আমাদের সম্পর্ক জীবন্ত এবং অবিচ্ছেদ্য। কৃতজ্ঞতা বোধ এবং শ্রদ্ধাবোধ থেকে আমরা এই মাটিকে মায়ের স্থানে বসিয়েছি। দশপ্রহরণধারিণী দেবী দুর্গারূপে তাঁর পূজা করেছি বন্দেমাতরম মন্ত্রে।    

আমাদের পূর্বপুরুষদের কঠোর সাধনায় যে জীবনধারার ক্রমবিকাশ এই মাটির উপরে হয়েছিল, আমরা এই বঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে গেলে আজও সেই সনাতনী জীবনদর্শনের ফলিত রূপ দেখতে পাই। ঘুম থেকে ওঠার পরে মাটিতে পা দেওয়ার আগে মাটিকে প্রণাম করার অভ্যাস এখনও দেখতে পাওয়া যায়। মাটিতে পা দিয়ে আঘাত করলে আজও আমাদের বাড়ির বয়স্করা বাচ্চাদের নিষেধ করে বলেন- এরকম করলে ধরিত্রী মায়ের আঘাত লাগবে। আমাদের বাড়ির মায়েরা আজও অম্বুবাচী পালন করেন কারণ তাদের বিশ্বাস- ওই নির্দিষ্ট সময়ে ধরিত্রী মাতা রজঃশলা হন। বাড়িতে বাড়িতে তুলসী গাছকে শ্রদ্ধা সহকারে প্রণাম করা আজও আমাদের পরম্পরা। আধুনিক বিজ্ঞান গাছের মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণ করার অনেক যুগ আগে থেকেই আমাদের গ্রামের নিরক্ষর বুড়ি মায়েরা তাদের নাতি-নাতনীদের সহজ ভাষায় শিক্ষা দিয়ে এসেছেন যে রাতে গাছের পাতা অথবা ফুল ছিড়তে নেই কারণ রাতে গাছেরাও আমাদের মত ঘুমায়। আমাদের দেশে ‘গাছ মরে যায়’! কে মরে যেতে পারে? সে ই মরতে পারে যে জীবিত আছে! এর অর্থ হল উদ্ভিদের যে প্রাণ আছে তার উপলব্ধি আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের বহুকাল আগে থেকেই ছিল। গাছের সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপন, জলাশয় খনন- বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না জানলেও ‘ধর্ম’ হিসেবে গ্রামবাংলার তথাকথিত অশিক্ষিত সনাতনীরা এগুলো পালন করতে অভ্যস্ত আছেন। আধুনিক বিজ্ঞান যখন থেকে জড় (Mass) আর চৈতন্য (Energy)-র পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে, তার অনেক আগে থেকেই তথাকথিত অশিক্ষিত সনাতনীরা জানে যে জড়বস্তুর মধ্যেও চৈতন্যের অস্তিত্ব আছে। আজও ট্রেনে অথবা বাসে চড়ে কোনও নদী পার হওয়ার সময় কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করতে দেখা যায় অনেককেই। এই অভ্যাস মোটেই মোদীজীর ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর থেকে শুরু হয় নি। মানুষের জীবনে নদীর অবদানের কথা স্মরণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার সনাতনী জীবনদর্শনেরই চিরন্তন শিক্ষা। এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে ধারাবাহিকভাবে সঞ্চারিত হতে হতে এই বিশিষ্ট্য জীবনধারা অনুযায়ী আচরণ আমাদের সহজাত প্রবৃত্তিতে পরিণত হয়েছিল। এই ভাবেই গড়ে উঠেছিল আমাদের সংস্কৃতি।

এই প্রকৃতিরই অঙ্গ হওয়ার কারণে মানুষেরও প্রাকৃতিক চাহিদা আছে। কিন্তু মানুষের প্রাকৃতিক চাহিদা পুরণ করতে গিয়ে যাতে Eco balance যাতে নষ্ট না হয় সে কথাও ভাবা দরকার। প্রকৃতির নিয়মেই আমাদের খিদে পায়। খাদ্য গ্রহণ করলে আমাদের দেহ ও মন পরিতৃপ্ত হয়। পাশাপাশি এটাও সত্য যে আমার আপনজন কেউ অভুক্ত থাকলে সুস্বাদু খাদ্য খেয়েও মনে কষ্ট থেকে যায়। মনে করুন প্রাকৃতিক নিয়মে আমার খিদে পেয়েছে, একই কারণে আমার পরিবারের সদস্যদেরও খিদে পেয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে আমরা সবাই কি খাওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করবো? না কি যেটুকু খাবার আছে সেটা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে খাবো? খিদে পাওয়া প্রকৃতি। কাড়াকাড়ি করে খাওয়াটা হল বিকৃতি। কিন্তু অপরের জন্য প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করে ভাগাভাগি করে খাওয়াটা হল সংস্কৃতি। আজকে কোরোনা-র জন্য বিজ্ঞাপন দিয়ে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে- নাকে মুখে রুমাল দিয়ে হাঁচুন। হাঁচির উদ্রেক হয় তো প্রাকৃতিক কারণে। এটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এবার আপনি অন্যের মুখের উপরে হাঁচতেই পারেন। সেটা বিকৃতি হিসেবেই গণ্য হবে কিন্তু মুখে রুমাল দিয়ে হাঁচি দিলে সেটাই সংস্কৃতি। যে যত বেশী অন্যের সুবিধা-অসুবিধার কথা ভেবে নিজের আচরণকে সংযত করবে, সে ততই সভ্য এবং সংস্কৃত। সনাতনী জীবনদর্শনের ভিত্তিতে আমাদের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তার মূল ভিত্তি ছিল ত্যাগ। বলা হত ত্যাজদেকং কুলস্যার্থে, গ্রামস্যার্থে কুলং ত্যাজেৎ/ গ্রামং জনপদস্যার্থে, আত্মার্থে পৃথিবীং ত্যাজেৎ।। অর্থাৎ পরিবারের জন্য প্রয়োজনে ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করতে হবে, গ্রামের জন্য পরিবারের স্বার্থ। আবার জনপদ অর্থাৎ আরও বৃহত্তর স্বার্থে গ্রামের স্বার্থ ত্যাগ করতে হবে এবং সর্বোপরি সত্যের জন্য প্রয়োজনে সবকিছুই ত্যাগ করতে হবে। এই সংস্কৃতির ধারক বাহক হিসেবে আমাদের কি গর্ব করা উচিত নয়? এই সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু মানবতা নয়, সমগ্র সৃষ্টিকে রক্ষা করার পথ দেখাবে কে?  

মাতৃস্বরূপা আমাদের এই ভূমি, তার সন্তানদের নিয়ে গঠিত সমাজ, সনাতনী জীবনদর্শনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আমাদের সংস্কৃতি এবং নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের জন্য বিকশিত হওয়া আমাদের বাংলা ভাষা- এই সবের সমন্বয়ে আমাদের নিজস্ব একটা জাতিগত পরিচয় বা আইডেনটিটি তৈরি হয়েছে। সেই পরিচয়ের প্রকাশক শব্দ বা নাম হল ‘বাঙ্গালী’। এই নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের গৌরবময় ইতিহাস, আমাদের স্বাভিমান। এই নামই আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের শক্তি। এই নামই আমাদের সমাজবোধের কেন্দ্রবিন্দু, সনাতনী বঙ্গসন্তানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের জিয়নকাঠি। বাঙ্গালী নামই আমাদের এই বঙ্গভূমির মালিকানার দলিল। এই মাটির মালিকানা বজায় রাখতে হলে বাঙ্গালী পরিচয়ের মালিকানা ধরে রাখতে হবে। আর এই নামের মালিকানা দখলে রাখতে হলে আমাদের সমাজকে শক্তিশালী করতে হবে, আমাদের সংস্কৃতিকে নিজেদের আচরণে প্রতিফলিত করতে হবে এবং আমাদের ভাষাকে শুদ্ধ এবং সমৃদ্ধ করতে হবে। ভালো করে লক্ষ্য করুন, আজকে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি এবং ভাষা- এই তিনটে জিনিষই আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন? এগুলোকে ধ্বংস করতে না পারলে আইডেনটিটি বা নামের দখল নেওয়া যায় না। আর নামের দখল মানেই মাটির দখল।

সমাজকে দুর্বল করার জন্য ধর্মান্তরকরণের মাধ্যমে প্রতিদিন আমাদের ভাইবোনদের আমাদের সনাতনী সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথেই তারা এই মাটির সনাতনী সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে তাদের জীবনদর্শন। সাথে সাথে লাভ জেহাদ, অনিয়ন্ত্রিত জন্মহার ইত্যাদি বিভিন্ন কৌশলে নিজেদের জনসংখ্যা বাড়িয়ে জনভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে। সনাতনী বাঙ্গালী সমাজ হচ্ছে দুর্বল থেকে দুর্বলতর। পাশাপাশি আধুনিকতার নামে সনাতনী জীবনাদর্শের অপব্যাখ্যা করে তার প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরি করা হচ্ছে এবং এইভাবে আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলোকে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। আর বাংলা ভাষার ব্যাপক আরবীকরণের মাধ্যমে আমাদের ভাষাকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ যারা এই আক্রমণ চালাচ্ছে তারা কিন্তু বাঙ্গালী পরিচয়কে ছাড়ছে না। কারণ তারা জানে যে দেশের বর্তমান সিস্টেমের মধ্যে থেকে যদি এই মাটির মালিক হতে হয়, তাহলে নামের মালিক হতে হবে। আপাতত বাঙ্গালী নামের মুখোশের আড়ালে ভিতরে ভিতরে ব্যাপক হারে রদ বদলের কাজ চলছে। সব কিছুর আসল উদ্দেশ্য এই মাটির দখল। ইতিমধ্যেই এই বঙ্গের দুই তৃতীয়াংশ মাটি বেদখল হয়ে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এখনও এই ষড়যন্ত্রের স্বরূপ বুঝতে না পারলে একদিন সুন্দর সকালে দেখা যাবে এই মাটির মালিকানা আসল বাঙ্গালীর হাত থেকে নকল বাঙ্গালীর হাতে চলে গেছে। তাই নামের মালিকানা দখলে রাখতে হবে। আইডেনটিটি ধ্বংস হওয়া মানে জাতির বিনাশ। আইডেনটিটির সংকট মানে অস্তিত্বের সংকট। আইডেনটিটি বেদখল হয়ে যাওয়া মানে সমস্ত সম্পদ এবং অধিকার থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার যে, আমাদের আসল বাঙ্গালী পরিচয় কখনোই আমাদের ভারতীয় পরিচয়ের পরিপন্থী নয়। বরং এই বঙ্গ এবং বাঙ্গালী ভারতের সাথে সম্পূর্ণ একাত্ম থেকেছে, ভারতকে সমস্ত দিক দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে, ভারতকে রক্ষা করার জন্য আত্মবলিদান দিয়েছে এমনকি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একসময় ভারতকে নেতৃত্বও দিয়েছে।   

মাটির দখল নেওয়ার জন্যই ‘আসল বাঙ্গালী’কে ধ্বংস করার এই চক্রান্ত। এই চক্রান্তের জাল অনেক বিস্তৃত এবং এর শিকড়ও অনেক গভীরে প্রোথিত। ভাষাকে জাতি গঠনের মূল ভিত্তি ধরে ভারতকে টুকরো টুকরো করার ষড়যন্ত্র কমিউনিস্টদের পুরোনো এজেন্ডা। গোটা বঙ্গপ্রদেশকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এই কমিউনিস্টরা মহম্মদ আলি জিন্নার দেশভাগের দাবিকে সমর্থন করেছিল। মুসলিম লীগ এবং কমিউনিস্টদের যোগসাজসে রচিত এই চক্রান্ত ১৯৪৭ সালে সম্পূর্ণ সফল না হলেও এরা হাল ছেড়ে দেয় নি। বাংলা ভাষার জিগির তুলে বাঙ্গালী আইডেনটিটি হাইজ্যাক করে বাঙ্গালীদের সনাতনী শিকড়কে ভুলিয়ে দেওয়ার যে চক্রান্ত আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা সেই পুরোনো বামৈস্লামিক এজেন্ডারই আধুনিক রূপ। ৩৪ বছরের বাম শাসনকালে বাঙ্গালীর মন থেকে সনাতনী ভাবধারাকে মুছে দেওয়ার সবরকম চেষ্টা করা হয়েছে। বামৈস্লামিক শক্তি উপলব্ধি করেছিল পশ্চিমবঙ্গকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে গ্রেটার বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করতে হলে বাঙ্গালীকে তার সনাতনী শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কারণ এই সনাতনী শিকড়ই আমাদের ভারতের সাথে একাত্ম করে রেখেছে। তাই ইতিহাস বিকৃত করে, ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা করে আমাদের যুবসমাজের মনে তাদের পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে, তাদের অতীত সম্পর্কে লজ্জার ভাব তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে। বিভিন্নভাবে যুবসমাজকে বোঝানো হয়েছে যে সনাতনী জীবনধারা রিগ্রেসিভ, অচল। তাই আধুনিক হতে হলে, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এসব ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করতে হবে। অদৃষ্টের পরিহাস, আজ যখন সারা বিশ্ব অনুভব করছে যে সৃষ্টির সমূহ বিনাশ রোধ করতে হলে সবাইকে সনাতনী জীবনপদ্ধতিকেই গ্রহণ করতে হবে, হ্যান্ডশেক-হাগিং ছেড়ে সবাই হাতজোড় করে সনাতনী পদ্ধতিতে নমস্কার করছে, তখন এই কমিউনিস্টদের মাইক্রোস্কোপ দিয়েও দেখা যায় না! লুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকাভুক্ত হওয়ার পরেও এদের শয়তানির বিরাম নেই। কথায় আছে শয়তানেরা ঘুমায় না! বাঙ্গালীর সনাতনী পরিচয় ধ্বংস করার এই কাজে বামৈস্লামিক শক্তির ক্রীড়নক হিসেবে একটা দল বাঙ্গালী সেজে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই নকল বাঙ্গালীদের দলের নেতাদের দেখা গেছে বাংলাদেশের জামাতের নেতাদের সাথে মিটিং করতে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদেরও লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে বাঙ্গালীদের বিভ্রান্ত করার জন্য। এই পরিস্থিতিতে এই বঙ্গভূমিকে বাঁচাতে হলে বাঙ্গালীর সনাতনী শিকড়কে যেকোনও মূল্যে মজবুত করতে হবে। ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলেও বাঙ্গালীর সনাতনী শিকড়কে মজবুত করতে হবে। আসমুদ্রহিমাচল ব্যাপ্ত বৃহত্তর সনাতনী সমাজের সাথে একাত্ম হয়ে বেঁচে থাকতে হলেও বাঙ্গালীর সনাতনী শিকড়কে মজবুত করতে হবে।

শত্রুদের বিছানো ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বঙ্গভূমিকে ভারতসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই একটা বড় লড়াই। এই লড়াই ভারতকে জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে বসানোর লড়াই। এই লড়াই বাস্তবে মানব সভ্যতাকে বাঁচানোর লড়াই, সমগ্র সৃষ্টিকে রক্ষার লড়াই। শহর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জের প্রান্তিক বাঙ্গালীকে তার শিকড়ের পরিচয় করানোর এই কাজে ধর্মগুরুদের(অবশ্যই যাঁরা ভণ্ড নন)এগিয়ে আসতে হবে, যারা কবিগান এবং কীর্তন পরিবেশন করেন তাদেরও এই লড়াইয়ে বিশেষ ভুমিকা নিতে হবে। এই কাজে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে শিক্ষক, ইতিহাসবিদ, বৈজ্ঞানিক, গবেষক, লেখক, কবি, গায়ক, নাট্যকার, গীতিকার, চিত্রকর, চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা- এই ধরণের ব্যক্তিদের। বৌদ্ধিক ক্ষেত্রের এই লড়াই খুবই গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান করছি। লড়াই হবে বিভিন্ন আঙ্গিকে। লড়তে হবে গোটা বাঙ্গালী সমাজকে। হিন্দু সংহতি এই মহাযুদ্ধে ঐতিহাসিক ভুমিকা পালন করার জন্য প্রস্তুত।

Wednesday, April 29, 2020

হিন্দু সংহতির লক্ষ্য কি? (১)


এই নিখিল বিশ্ব একটা সিস্টেমের মধ্যে বাঁধা আছে। এই সৌরজগতের সব কয়টি গ্রহ সূর্যের চারদিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথ ধরে, নির্দিষ্ট গতিতে ঘুরছে। উপগ্রহ গুলো আবার এক একটা নির্দিষ্ট গ্রহকে কেন্দ্র করে একই রকম ভাবে নির্দিষ্ট কক্ষপথ ধরে নির্দিষ্ট গতিতে ঘুরছে। অনন্তকাল ধরে এই প্রক্রিয়া চলছে, তার কোনও ব্যতিক্রম নেই। একটা গ্রহও ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে না, একে অপরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করছে না অথবা সূর্যের উপরেও আছড়ে পড়ছে না। সেন্ট্রিপিটাল ফোর্স এবং সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্সের ভারসাম্য অনাদি অনন্তকাল ধরে এই ব্যবস্থাকে সচল রেখেছে। এই ভারসাম্য কোনও কারণে নষ্ট হলে সৌরজগত সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে।

পৃথিবী আবার তার নিজের অক্ষকে কেন্দ্র করে লাট্টুর মত ঘুরছে। আমরা এই পৃথিবীতে বাস করছি। মানুষ ছাড়াও অন্যান্য পশুপাখী, গাছপালা, জল এমনকি বায়ুমন্ডল এই পৃথিবীর পিঠের উপরে অবস্থান করছে। মাধ্যাকর্ষণের দ্বারা পৃথিবী আমাদের সবাইকে কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করছে, ফলে আমরা পৃথিবীর এই আবর্তন গতি সত্ত্বেও মহাশূন্যে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছি না। এই আকর্ষণ এবং গতিজনিত বিকর্ষণ বলের  ভারসাম্য যদি কোনও কারণে নষ্ট হয়ে যায়, ভাবুনতো পরিস্থিতিটা কী হতে পারে?

আবার পৃথিবীর সমস্ত জীব ও জড় কোনও না কোনও ভাবে পরস্পরের উপরে নির্ভরশীল। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেও একটা সমন্বয় আছে, যার ফলে প্রকৃতিতে একটা ভারসাম্য রক্ষিত হচ্ছে। ভাবুন তো যদি পর্যাপ্ত পরিমান বায়ুর অভাব হয় অথবা বায়ু দুষিত হয়ে যায়, তাহলে মানুষ, পশুপাখী কিংবা গাছপালার অস্তিত্ব কতটা সংকটগ্রস্থ হবে! অস্তিত্ব রক্ষায় মাটি এবং জলের ভুমিকাও একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। আবার সাতদিন যদি পৃথিবীতে সূর্যের আলো না পরে তাহলে ভাবুন তো এই সৃষ্টির কী হবে? আবার দেখুন গাছপালার সাথে জীবের সম্পর্ক কীভাবে ওতপ্রত জড়িয়ে আছে! গাছ আমাদের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দিচ্ছে, আমরা গাছকে তার জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন ডাই অক্সাইড দিচ্ছি। এছাড়াও গাছ আমাদের খাদ্য, ঔষধি এমনকি প্রত্যক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে জ্বালানির যোগান দিচ্ছে। আবার গাছপালা থাকায় মাটির জল ধারণ ক্ষমতা বাড়ছে, প্রকৃতির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকছে, বৃষ্টিপাতের মাত্রা ঠিক থাকছে। এর বিনিময়ে কি আমাদের কর্তব্য নয় গাছের সংরক্ষণ করা? আমরা যদি গাছ বাঁচাতে না পারি, গাছ কেটে বনাঞ্চল ধ্বংস করি তাহলে এই ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং পরিনামে এই সৃষ্টিই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। এই কথা উপলব্ধি করেই আজকে সারা বিশ্ব গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে চিন্তিত। পরিবেশ রক্ষায় সবাই সচেষ্ট হয়েছেন, বৃক্ষরোপনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, জল সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, বায়ুমন্ডলের ওজন স্তর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে হাহুতাশ শোনা যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। একই রকম ভাবে মানুষের সাথে পশুপাখীর সম্পর্ক এমনকি মানুষের সাথে মানুষের এবং পশুপাখীদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্কেরও একটা প্রকৃতি নির্দিষ্ট ভারসাম্য আছে। চোখ মেলে তাকালেই সৃষ্টির সমস্ত উপাদানের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের একটা ভারসাম্য সহজেই দেখা যায়। খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে মানুষ হল প্রকৃতির সমস্ত উপাদানের মধ্যে একটি উপাদানমাত্র এবং সে অন্যান্য উপাদান গুলোর উপরে ১০০ শতাংশ নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতাকে স্বীকার করে প্রকৃতির অন্যান্য উপাদানগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতার ভাব রেখে তাদের সংরক্ষণ করাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষার উপায়- এই সত্যের সম্মুখীন মানুষকে আজ না হোক কাল হতেই হবে।

চার্লস ডারউইনের Struggle for Existence এবং Survival of the Fittest- এর তত্ত্ব অনুযায়ী আপাত দৃষ্টিতে প্রকৃতির উপাদানগুলোর মধ্যে একটা সংঘর্ষের আভাস দেখা গেলেও একটু গভীর ভাবে দেখলে তাদের মধ্যে একটা সমন্বয়ের স্পষ্ট উপস্থিতি আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। যে সমন্বয়ের দর্শন ডারউইন সাহেব না করলেও ভারতের মুনি ঋষিরা কিন্তু অনেক আগেই করতে পেরেছিলেন। তাই এই মাটি থেকে সমগ্র সৃষ্টি চরাচরের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছিল- “সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ/ সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু মা কশ্চিৎ দুঃখভাগ ভবেৎ।” এই কারণেই এই মাটিতে শুরু হয়েছিল প্রকৃতি পূজার পরম্পরা। আমাদের এই মাটি শুধু সকল জীবের মধ্যে শিবের দর্শন করার শিক্ষা দেয় নি, জড় পদার্থের মধ্যেও ঈশ্বর দর্শন করার শিক্ষা দিয়েছিল। মাটিকে মায়ের স্থান দেওয়া, বায়ু-অগ্নি-জলকে দেবতার স্থান দেওয়ার অর্থ ছিল প্রকৃতির এই উপাদানগুলির গুরুত্বকে স্বীকার করা। এইভাবেই জীবনকে দর্শন করেছিলেন আমাদের মুনি-ঋষিরা যে জীবন দর্শনের সার কথা ছিল Live and Let Live.

সৃষ্টির সমস্ত উপাদানের মধ্যে অন্তর্নিহিত সমন্বয়কে ব্যাহত না করার জন্য প্রয়োজনীয় আচরণবিধিকেই আমাদের এই পুণ্যভূমিতে ‘ধর্ম’ বলা হয়েছিল। মনে করা হত এই ধর্ম বা আচরণবিধিই Eco Balance রক্ষা করতে সক্ষম যার পরিনামে সমগ্র সৃষ্টির অস্তিত্বের নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত হতে পারে। তাই বলা হত ‘ধর্ম রক্ষতি রক্ষিতঃ’ অর্থাৎ ধর্ম রক্ষিত হলে ধর্মও রক্ষা করবে। তাহলে সংঘাত কি নেই? অবশ্যই আছে।     

কেউ কেউ কায়েমী স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই সমন্বয়ের নিয়মকে অস্বীকার করে। তারা প্রাকৃতিক সম্পদকে মানুষের অপরিমিত ভোগের সামগ্রী মনে করে যথেচ্ছভাবে প্রকৃতির শোষণ করে। তারা নিজেদের ভোগ বিলাসিতা এবং ক্ষমতার দম্ভে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষদেরও শোষণ করে, মানুষের উপরে অত্যাচার করে। যখন কেউ নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সুখভোগের উদ্দেশ্যে অন্য সকলকে শোষণের জাতাকলে নিষ্পেশিত করে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়, তখনই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় আর এই সংঘর্ষ তখন সৃষ্টিকে রক্ষা করার জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই সংঘর্ষ তখন একটা Necessary Evil হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই Eco Balance কে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে সংঘাত বা যুদ্ধ করাও ধর্ম। এই ধর্ম পালনের তাগিদেই ভগবান রামচন্দ্র প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ‘নিশিচরহীন করেঙ্গে ধরতী’। যারা Live and Let Live- এই মহান জীবনাদর্শকে ধ্বংস করতে সক্রিয় তাদের সাথে সংঘাতে যাওয়া এবং তাদের বিনাশ করাও যে ধর্ম, তার শিক্ষা এখান থেকেই পাওয়া যায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণও অর্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেছিলেন এই একই কারণে। তাই এই যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ বলা হয়।

সুতরাং এই মাটিতে যে জীবনদর্শনের বিকাশ হয়েছিল তার মূল কথা ছিল সমন্বয়। Live and Let Live এর এই আদর্শকে কায়েম রাখার জন্য উপযুক্ত আচরণবিধিই ছিল ধর্মের পরিভাষা। আমাদের দেবভূমির উপরে গড়ে ওঠা এই জীবনদর্শনের নামই সনাতন জীবনদর্শন। ‘সনাতন’ এই কারণে যে, বিশ্ব চরাচরের মধ্যে অন্তর্নিহিত সমন্বয়ের এই সত্য চিরন্তন। বাঁচতে হলে প্রকৃতিকে শোষণ করা যাবে না- এই ধর্ম স্থান, কাল এবং পাত্র ব্যতিরেকে সর্বদা সত্য। সুখে থাকতে হলে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়াতে হবে, সকলের মঙ্গল কামনা করতে হবে- এই ধর্মও সেই রকমই সর্বদা সত্য। আবার শান্তিতে থাকতে হলে ভাল লোকেদের নিরাপত্তা দিতে হবে এবং দুষ্কৃতিদের দমন করার জন্য লড়াই করতে হবে- এই ধর্মও সর্বদা সত্য। তাই আমাদের ধর্মের নামও সনাতন ধর্ম। আমাদের জীবনদর্শন কোনও লিখিত সংবিধান নয়, আমাদের ধর্মও একটি চুক্তিপত্র নয়- এ হল সৃষ্টি চরাচর যে নিয়মাবলী মেনে অনাদি অনন্তকাল ধরে একটা ভারসাম্য রক্ষা করে তার নিজের গতিতে চলছে- সেই নিয়মাবলীর আবিষ্কার।

গবেষণার ফলশ্রুতিই হল আবিষ্কার। একটা সাধারণ সূত্র আবিষ্কার হলেই সেবিষয়ে গবেষণা শেয হয়ে যায় না। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এবং বিভিন্ন আঙ্গিকে সেই সূত্রের প্রয়োগ এমনকি বার বার তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্যও গবেষণা চলতে থাকে। গবেষণা বন্ধ হয়ে গেলে অগ্রগতিও থেমে যায়। তাই সনাতনী জীবনাদর্শের বৈশিষ্ট্য হল গবেষণা, প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা। দর্শন মানে দেখা। সত্যকে দেখার পরেই বিশ্বাস করতে হবে, তার আগে নয়। অন্যের চোখ দিয়ে দেখায় সন্তুষ্ট হওয়াকে স্বীকার করে না সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গী। স্বামী বিবেকানন্দ ছোটবেলায় যেমন গাছে দোল খেতে খেতে বন্ধুদের বলেছিলেন, গাছে ব্রহ্মদৈত্য আছে কিনা সেটা নিজের চোখে দেখার পরেই তিনি বিশ্বাস করবেন। সেই স্বামীজীই পরে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, ‘আপনি নিজে ঈশ্বরকে দেখেছেন’? তাই এই মাটি হচ্ছে Land of seekers, not a land of believers. এই উদার এবং যুক্তিপূর্ণ সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গীই হচ্ছে ক্রমবিকাশের প্রধান শর্ত। বিকাশের চরম পর্যায়ে সমাজকে পৌঁছাতে হলে এই Openness এর সংরক্ষণ করতে হবে।

আমাদের পুণ্য বঙ্গভূমির নিরাপত্তার সাথে সাথে এই ভূমিতে উৎপন্ন সনাতনী জীবনদর্শন- Live and Let Live এবং চিন্তার এই Openness কে সংকীর্ণ আব্রাহামিক মতবাদ, ব্যর্থ কমিউনিস্ট মতবাদ এবং আরও অনেকগুলি বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির যৌথ আক্রমণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য একটা বড় লড়াই আমাদের লড়তে হবে। হিন্দু সংহতিকে এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে হবে। এই গুরু দায়িত্ব পালন করার শক্তি ও সামর্থ্য অর্জন করাই এখন হিন্দু সংহতির সদস্যদের প্রধান কাজ।      

Tuesday, March 10, 2020

তোমার প্রেরণা যদি মে-দিবস হতে পারে, দিওয়ালি কেন আমার নয়?

কালিপূজা নাকি দীপাবলী(দিওয়ালি)- কোনটা আমার কোনটা আমার নয়। ন্যারেটিভ নামছে বিভিন্ন আঙ্গিকে। যারা ধর্মকে আফিম বলতো, তারাও আজ বলছে আমাদের কালিপূজা, দিওয়ালি আমাদের নয়! প্রশ্নটা বাঙ্গালী এই ন্যারেটিভ খাবে কি খাবেনা তা নিয়ে নয়, প্রশ্নটা হচ্ছে এরা বাঙ্গালীর বুদ্ধিবৃত্তির খিল্লি উড়াচ্ছে এটা যে বাঙ্গালী বুঝে নিয়েছে সেটা আজও কেন এরা বুঝতে পারে না?

পাকিস্তানের দাবিকে সমর্থন, পাকিস্তান সৃষ্টির পর দেশভাগের বলি বাঙ্গালী উদ্বাস্তু ভোটব্যাঙ্কের উপরেই ভিত্তি করে ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা! কী অদ্ভুত না? একদিকে দলিতের মসীহা সেজে 'ওরা জীবনের গান গাইতে দেয় না' অথবা 'হো হো হো হো হেনরির হাতুড়ির সুর'- এ আকাশ বাতাস মুখরিত করে রাখা, অন্যদিকে মরিচঝাঁপিতে সেই দলিত নমঃশূদ্রদের মাথায় হেনরির হাতুড়ির নির্মম আঘাত হানা! আজও সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতা করে যারা দলিত বাঙ্গালী উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ বানচাল করে দিতে চায়, তারাই বাঙ্গালীর মুখ হয়ে উঠতে চাইছে বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী হিন্দুদের মধ্যে লড়াই লাগিয়ে দিয়ে! অথচ একদিন এরাই বলতো এদের দৃষ্টিতে সমাজ কেবলমাত্র দুটো শ্রেণিতে বিভক্ত- Haves আর Have nots! নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে প্রতিদিন এরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে কেবলমাত্র এই বিশ্বাসে যে জনগণের (পড়ুন বাঙ্গালীর) কোনদিনই তাদের এই দ্বিচারিতা ধরে ফেলার বুদ্ধি জন্মাবে না। আজ ৭% এ বান্ডিল হয়ে গিয়েও তাদের এই বিশ্বাস অটুট! কী আশ্চর্য রকমের নির্বোধ এরা!

আমার সোজাসুজি প্রশ্ন- রাশিয়া, চিন কিংবা ভিয়েতনাম যদি তোমার প্রেরণা হতে পারে, ভারতের অযোধ্যা কেন বাঙ্গালীর প্রেরণা হতে পারে না? হেনরির হাতুড়ি যদি তোমার প্রেরণা হতে পারে, রামচন্দ্রের ধনুষ্-বাণ কেন বাঙ্গালীর প্রেরণা হতে পারে না? আমেরিকার মে-দিবস যদি তোমার প্রেরণা হতে পারে, অযোধ্যার দিওয়ালি কেন বাঙ্গালীর প্রেরণা হতে পারে না? 

অন্য একটা আঙ্গিকে এই বিষয়টাকে দেখা যাক। কালিপূজা হল শাক্ত বাঙ্গালীর মূলধারা। যেখানেই বাঙ্গালী, সেখানেই মা কালী। এটা এক্সক্লুসিভলি বাঙ্গালীর। দীপাবলী বা দিওয়ালির সাথে বাঙ্গালীর এই কালীপূজার সম্পর্ক বিশেষ কিছু নেই। তবে দিওয়ালি কি? নিজেদের পরাক্রমে রাবণকে বধ করে স্বর্ণলঙ্কা বিজয়ের পরে রামানুজ লক্ষ্মণের মনে হল এই সমৃদ্ধ নগরী ছেড়ে আবার অযোধ্যায় ফিরে যাওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়! এই প্রস্তাব শোনার পরে শ্রীরাম বললেন 'অপি স্বর্ণময়ী লঙ্কা, ন মে রোচতে লক্ষ্মণ/ জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী'। সুতরাং এবার ঘরে ফেরার পালা। শ্রীরাম  অযোধ্যায় ফিরছেন। অযোধ্যাবাসী স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। কিন্তু সেই দিনটা ছিল অমাবস্যা। অমাবস্যার অন্ধকার কাটাতে অযোধ্যা নগরীকে দীপের আলোর সাজে সাজানো হল সেই রাতে। সেই থেকে দীপাবলী বা দিওয়ালি। অর্থাৎ দিওয়ালি হল ঘরে ফেরার উৎসব।

বাঙ্গালীর উদ্বাস্তুরা এই দিওয়ালিকে আপন করে নিতে পারে না 'ঘরে ফেরা'-র সংকল্পের প্রেরণা হিসেবে? কি ভাবছেন? আকাশ কুসুম কল্পনা? ফ্যান্টাস্টিক ননসেন্স? ইহুদীরা ঘরে ফিরতে পেরেছে? হ্যাঁ, হয়তো প্রায় দু'হাজার বছর লেগেছে। কিন্তু ফিরেছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে কয়েক প্রজন্ম ঘরে ফেরার স্বপ্ন, এই সংকল্পের আগুনকে বুকে জ্বালিয়ে রেখেছে এবং তারজন্য চেষ্টা করেছে বলেই তো সেটা সম্ভব হয়েছে! আমরা ভাবতে পারি না ঘরে ফেরার উৎসব একদিন আমরাও পালন করবো? রমনার কালীমন্দিরে কিংবা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে? যশোর থেকে সিলেট, দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রাম আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে কোনও এক রাতে! আমরা ঘরে ফিরবো! হ্যাঁ, অখণ্ড বাংলা হবে। তবে সেটা গ্রেটার বাংলাদেশ নয়, সেটা হবে গ্রেটার পশ্চিমবঙ্গ, অখণ্ড সনাতনী বাংলা।

Monday, January 27, 2020

যদি বাঙাল হিসেবে গর্ব করতেই হয়, সেটা ঢাকার ধানমন্ডিতে দাঁড়িয়ে করবো

আমি একজন সনাতনী। আমি একজন বাঙ্গালী, বিশেষত একজন বাঙাল। প্রত‍্যেকটা আইডেন্টিটি আমার কাছে সমান গুরুত্বের। বাঙাল হিসেবে গর্ব করার মত অনেক কিছুই আছে আমাদের, যা 'অবাঙাল' দের কাছে ঈর্ষণীয়। কিন্তু যেদিন পায়ের তলার মাটি হারিয়েছি, সেদিন থেকে আমাদের এই গৌরবময় ইতিহাস নিয়ে গর্ব করার অধিকার আমরা হারিয়েছি। পরাজিত জাতি যতক্ষণ পর্যন্ত বিজেতাকে পদানত করে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে না পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার গর্ব করার কিছুই থাকতে পারে না।
পরাজিত জাতির মধ্যে যেমন বিনয়-বাদল-দীনেশ-মাস্টারদা জন্মান, সেইরকমই অসংখ্য নেত্রসেন, জ্যোতি বোস, সুজন চক্রবর্তীরাও জন্মগ্রহণ করেন। আমি প্রথম দলেই নাম লিখিয়েছি। যে মাটি আমাকে ঠাঁই দিয়েছে তাকে রক্ষা করা এবং বাপ-ঠাকুরদার হারানো মাটি পুনরায় অধিকার করার জন‍্য‌ই আমার এই লড়াই। মৌলবাদী ইসলামের কারণে আমার প্রতিটি আইডেন্টিটি আজ বিপন্ন। এই লড়াইয়ে আমি সনাতনী মূলের প্রত্যেককে সাথে চাই।
যদি বাঙাল হিসেবে গর্ব করতেই হয়, সেটা ঢাকার ধানমন্ডিতে দাঁড়িয়ে করবো, রমনা কালীমন্দিরে মায়ের পূজা দিয়ে করবো। আমি না পারলে আমার ছেলে, সে না পারলে তার ছেলে করবে। কিন্তু ঘরে একদিন আমরা ফিরবোই। ততদিন শুধুই লড়াই, শুধুমাত্র লড়াই।

রক্ত দিয়ে কেনা মাটি কাগজ দিয়ে নয়


কলকাতার ডার্বি চলছে। ‘রক্ত দিয়ে কেনা মাটি কাগজ দিয়ে নয়’ লেখা একটি ব্যানার শোভা পাচ্ছে ইস্টবেঙ্গল গ্যালারির মাথায়। ম্যাচ শেষ হতে না হতেই নেট দুনিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন। কে জিতলো, কে হারলো সেটা হয়ে গেল গৌণ। বাঙালীর ফুটবলের আবেগ রূপ নিলো রাজনীতির তড়জায়!

এই ব্যানারটা লাগিয়েছিলো ইস্টবেঙ্গল আল্ট্রাস্ নামের একটি গ্রুপ। এরা মূলতঃ বামপন্থীদের একটা গোষ্ঠী। যদিও বামপন্থীরা বর্তমানে লুপ্তপ্রায়, তবে যেকজন টিকে আছে তারা কুমীরের ছানার মত সময় ও সুযোগ বুঝে বিভিন্ন মঞ্চে হাজির হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে। কারণ তাদের ‘দীর্ঘজীবী বিপ্লব’ এখন সাত পার্সেন্টে এসে ঠেকেছে। আর সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের পরে তারা এখন একেবারে চোরাবালির উপরে দণ্ডায়মান। এই সাত পার্সেন্ট কমতে কমতে ২০২১-এ যে দুই পার্সেন্টেও টিকবে না – এটা তারা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। তাই এখন যেকোনো ভাবে ভেসে থাকতে হবে, খবরে থাকতে হবে, চর্চায় থাকতে হবে। তাই কিছুটা অক্সিজেন পাওয়ার আশায় ডার্বির মাঠে সিএএ বিরোধী ব্যানার টাঙানো।

আমাদের ছোটবেলায় পাড়ার কিনুকাকা আমাদের জোকস্ শুনাতেন, আমরাও আগ্রহ সহকারে সেগুলো রীতিমত গিলতাম। একদিন কিনুকাকা শুরু করলেন; বুঝলি, একবার একটা ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে কলকাতায়। বিষয় হল কার টেকনোলজি কত উন্নত। জাপানের বৈজ্ঞানিকরা এমন একটা সূঁচ তৈরি করে ফেললো যে সেটা খালি চোখে দেখাই যায় না! তখন আমেরিকার বৈজ্ঞানিকরা এগিয়ে এলো। সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে তারা সেই সূঁচের মধ্যে একটা ফুঁটো করে দিলো। ব্যাস্! পৃথিবীর সব দেশের বৈজ্ঞানিকরা হাত তুলে দিলো। সেরা পুরষ্কার আমেরিকার সেই বৈজ্ঞানিকের হাতে তুলে দেওয়া হবে, ঠিক সেই মূহুর্তে আমাদের ১০নং ওয়ার্ডের সর্বহারার নেতা কমরেড বিভাসদা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে একেবারে মঞ্চের উপরে এসে হাজির! দাদা একটা চান্স্ দেবেন আমায়? না হলে কিন্তু ইউনিয়নের লোক ডেকে সব ভন্ডুল করে দোবো বলেদিলাম! অগত্যা, সেই সূঁচ তুলে দেওয়া হল কমরেড বিভাসের হাতে। কারণ রাজ্যে তখন মানুষের শরীরের রক্ত বাদে সবকিছুই লাল। কমরেড তখন পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেটটা বের করে তার মধ্যে সুঁচটা ঢুকিয়ে দিলো আর সেই প্যাকেটের উপরে লিখে দিলো ‘Made in China’। তারপর হাত মুঠো করে আকাশে ঘুষি মেরে বললো ‘চিনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান’!

এটাই বাম-বামাতিদের সংস্কৃতি। অন্যের প্রডাক্টে নিজেদের ট্রেডমার্ক লাগিয়ে বেচে দেওয়াটাই তাদের বিপ্লবের কঠিন পথ। আপনি দুর্গাপূজা করুন, এরা সেই আসরে নিজেদের ‘ধর্ম মানে আফিম’ শীর্ষক বই বেচতে চলে আসবে। আপনি পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করুন, সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার দুজন কমরেডকে মঞ্চে তুলে ‘ওরা জীবনের গান গাইতে দেয় না’ অথবা ‘হেনরির হাতুড়ি’ গাইয়ে আপনার মঞ্চটাকেই ওদের বিপ্লবী মঞ্চে পরিণত করার চেষ্টা করবে। একই ভাবে ডার্বির মাঠে ওদের প্রথম লক্ষ্য ছিল মিডিয়া অ্যাটেনশন, আর দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল নিজেদের মতামতটাকে গোটা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের মতামত বলে চালিয়ে দেওয়া, যেন গোটা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সভ্য-সমর্থক তথা বৃহত্তর ইস্টবেঙ্গল সমাজ (ওপার বাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু সমাজ)-এর প্রতিনিধিত্ব ওরাই করছে। এটা ছিলো গোটা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের উপরে ‘সিএএ বিরোধী’ তকমা লাগিয়ে দেওয়ার একটা অপচেষ্টা।

এতো গেল বাম-বামাতিদের দুর্বুদ্ধির কথা। এবার আসি রক্ত দিয়ে মাটি কেনার বিষয়ে। বলুন তো এপারে এসে মাটি কিনতে কতজনকে ক‌’ফোঁটা রক্ত দিতে হয়েছে! উদ্বাস্তুদের এপারে থাকার জন্য কার সাথে লড়াই করতে হয়েছে? যদি কেউ এই উদ্বাস্তুদের রক্ত ঝরিয়ে থাকে, তারা হল এই বামপন্থীরাই! মরিচঝাঁপির ইতিহাস নিশ্চই আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না! আজকে তারাই বলছে রক্ত দিয়ে কেনা মাটি! তাই এই রক্ত দিয়ে মাটি কেনার দাবী বাম-বামাতিদের মুখে শোভা পায় না। আর যদি পরিশ্রম ও কষ্টকে রক্তমূল্য ধরা হয় তাহলে এই কষ্টের কারণ কি? এই পরিশ্রম কেন? কেন গোলাভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ওপারে ফেলে এপারে আসতে হল? কারা সেগুলো কেড়ে নিয়েছিল? কারা তাদের বাড়িতে আগুন দিয়েছিল? কারা তাদের বাপ-ঠাকুরদাকে খুন করেছিল? কারা তাদের পরিবারের মহিলাদের ধর্ষণ করেছিল? কারা তাদের রক্ত ঝরিয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কি তাদের অজানা? যারা আজ বড় গলায় বলছে রক্ত দিয়ে কেনা মাটি তাদের বলতে চাই, রক্ত দিয়ে মাটি তোমরা কেনো নি ভাই, তোমাদের রক্ত সিঞ্চিত মাটি মুসলমানরা তোমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। আজ একথা স্বীকার করার মত সাহসও তোমাদের নেই। মাস্টারদা সূর্যসেন, লোকনাথ বল, প্রীতিলতাদের রক্তসিঞ্চিত সেই জালালাবাদের মাটির অধিকার দাবী করার সতসাহস আছে তোমাদের? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তোমাদের পূর্বপুরুষ যাঁরা আত্মবলিদান দিয়েছিলেন, তাদের রক্তস্নাত মাটির অধিকার দাবী করার সতসাহস আছে ভাই? তাদের রক্তের মূল্য কি তোমরা কোনও দিন দিয়েছো বা ভবিষ্যতেও কোনও দিন দিতে পারবে? তাই রক্তদানের কথা আজ তোমাদের মুখে শোভা পায় না। তোমরা আগাপাস্তলা ভণ্ড।

রইলো কাগজের কথা। আজও ঠাকুরদার পুরোনো টিনের বাক্সটা হাতিয়ে দেখো। যশোর কিংবা ময়মনসিংয়ে ফেলে আসা ভিটের কাগজটা সযত্নে রাখা আছে হয়তো। আজও আশা আছে, যদি কোনোদিন এই কাগজের মূল্য পাওয়া যায়! আমি শুনেছি একটা রিফিউজি সার্টিফিকেটের জন্য হন্যে হয়ে সরকারী অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানোর ইতিহাস। আমি দেখেছি এনিমি প্রোপার্টির কাগজ নিয়ে সরকারী অফিসের সামনে লম্বা লাইন দিয়ে মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে। যদি এই কাগজের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু অর্থমূল্য পাওয়া যায়! ওপার থেকে এপরে এসে একটা জাল রেশন কার্ড, একটা জাল ভোটার কার্ড নিদেনপক্ষে একটা ভুয়ো স্কুল সার্টিফিকেটের জন্য কী পরিমান ছোটাছুটি মনে নেই! সেগুলোও তো নিছক কাগজই, তাই নয় কি? সুতরাং ওপার থেকে এপারে আসার পর আজ তোমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো, তোমাদের পূর্বসুরীদের মেধা এবং পরিশ্রমের বেশীরভাগটাই খরচ হয়েছে কাগজ যোগাড় করার জন্য।

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন জাতীয়তাবাদী শক্তি (Making India Force)এবং জাতীয়তাবিরোধী শক্তিকে (Breaking India Force)- এই দুটি শিবিরে ভাগ করে দিয়েছে। আজ সময় এসেছে, আমাদের সঠিক পক্ষ বেছে নেওয়ার। বন্ধ্যা নারীর যেমন গর্ভযন্ত্রণার বিবরণ দেওয়া বাতুলতা মাত্র, ঠিক সেইভাবেই সেকুলার বাঙালদের মুখ দিয়ে ‘রক্তের মূল্য’ সম্পর্কে বেশী কিছু প্রকাশিত না হওয়াই ভাল। যারা বৈধ নাগরিকত্বের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এবং জাল কাগজের ভিত্তিতে বেঁচে থাকাকে সম্মানজনক মনে করে, শেষপর্যন্ত কি তাদের কাছে রক্তের মূল্য সম্পর্কে শিক্ষা নিতে হবে! এরা আসলে ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’-য়ের স্লিপার সেল। এদের চিহ্নিত করতে হবে এবং এদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনকে দুহাত তুলে স্বাগত জানান এবং নিশ্চিতভাবে জানুন, এই আইনই বাস্তবে ছিন্নমূল ভারতপ্রেমীদের রক্তের মূল্য এবং মর্যাদা দিয়েছে।              

x

Tuesday, November 26, 2019

হিন্দু ভোট যত কনসলিডেট হবে, হিন্দু তোষণের প্রতিযোগিতা তত বাড়বে

যেদিন রামমন্দির ইস্যু প্রথমবার সকলের সামনে এসেছিলো, সেই দিনটাতেই বোধহয় ভারতের রাজনীতির হিন্দুকরণের সূত্রপাত হয়েছিল বলে ধরা যায়। হিন্দুদের কোনও দাবি নিয়ে যে রাজনীতি হতে পারে, এর আগে এটা অবাস্তব বলে মনে হত সবার। কিন্তু ভারতের রাজনীতিকে ধর্মের ভিত্তিতে দ্বিখন্ডিত করে দিল এই ইস্যু। ভারতের রাজনীতিতে আগে ছিল শুধুই মুসলিম পক্ষ। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের পাখির চোখ ছিল মুসলিম ভোট। রামজন্মভূমি আন্দোলন থেকে শুরু হল হিন্দুর রাজনৈতিক কনসলিডেশন। হিন্দুরা এবার একটা পক্ষ হল। তাদের একটা আত্মবিশ্বাস জন্মালো - যে হিন্দুরা বাবরি মসজিদকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, তাদের অসাধ্য আর কী থাকতে পারে! এই আত্মবিশ্বাস থেকেই তৈরি হল হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক আর এই ভোটব্যাঙ্ককে পাখির চোখ করল বিজেপি। বিজেপির উত্থান এই হিন্দু ভোটের উপরে ভিত্তি করেই। রামজন্মভূমি আন্দোলন‌ই বিজেপিকে ভারতের রাজনীতিতে এসকেপ্ ভেলসিটির ইন্ধন যোগালো।

যদিও ভারতের রাজনীতির গতি প্রকৃতি আগেও হিন্দুরাই নির্ধারণ করতো, কিন্তু এই বোধ হিন্দুদের এর আগে ছিল না। একটা মিথ্যা ন্যারেটিভ সুন্দর ভাবে পরিবেশন করা হত - মুসলিম ব্লকভোট‌ই ভারতের রাজনীতির ভাগ্যনিয়ন্তা। আর এই মিথ্যাকে ছন্নছাড়া হিন্দুরা বিশ্বাস করতো মনেপ্রাণে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্বের অধিকাংশ এখনও এই বিশ্বাস নিয়েই রাজনীতি করে যে মুসলিম ভোট না পেলে এরাজ্যে ক্ষমতা দখল করা সম্ভব নয়। তাদের এই ধারণার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। 

বিশ্ববাসীর ভুল ভাঙলো ২০১৪ সালের সেই দিনটাতে, যেদিন গুজরাটের গোধরায় হিন্দু হত্যার দৃষ্টান্তমূলক প্রতিশোধের নায়করূপে অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হলেন। এই জয় বাস্তবে বিজেপির জয় ছিল না, এই জয় ছিল দীর্ঘদিনের পরাজয়ের গ্লানি বুকে চেপে রাখা, নিজের দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের ব্যবহার পেয় লাঞ্ছিত, অপমানিত হতে থাকা হিন্দুদের বহু আকাঙ্খিত জয়। হিন্দুরা মোদিজীর অভিষেক চেয়েছিল, তাই মোদিজী সিংহাসনে বসেছিলেন। তাই আমরা দেখলাম উন্নয়নের জোয়ার ব‌ইয়ে দেওয়া স্বপ্নের নায়ক উদারচতা বাজপেয়ীজীর ফিলগুডের সরকার পরাজিত হলেও ২০১৪-তে ব্যাপক জনসমর্থন পেলো মুসলমানের রক্তে হোলি খেলার তকমাধারী নরেন্দ্র মোদির সরকার। 

২০১৪ র নির্বাচনের ফলাফল হিন্দুদের আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল এবং মোদিজীও এই পাল্স বুঝে নিয়েছিলেন সঠিকভাবেই। তাই পাকিস্তানে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, তিন তালাক নিষেধ, বারাণসীর তীরে গঙ্গারতি, সৌদি আরবে মন্দির নির্মাণ, নাগরিকত্ব বিল লোকসভায় পাশ করানো মোদি সরকার ২০১৯-এ হল আরও অনেক বেশি শক্তিশালী। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি এই সরকারকে। নিয়ে চলেছে একের পর এক কঠোর এবং সাহসী সিদ্ধান্ত - ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি, রামমন্দির তৈরির পথ প্রশস্ত করার পথ ধরে আবার আসছে নাগরিকত্ব বিল এবং তারপরে এন‌আরসি। দ্বর্থ্যহীন ভাষায় সরকারের সাহসী ঘোষণা - বহিরাগত হিন্দুরা শরণার্থী আর মুসলমানরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী! দেশটা হিন্দুরাষ্ট্র হতে আর বাকি র‌ইলো কী!

সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলো হিন্দুদের প্রতি ন্যায় বিচার তো অবশ্যই, কিন্তু যদি রাজনীতির পরিভাষায় কেউ একে 'হিন্দু তোষণ' বলে, সে কি বিরাট ভুল করে ফেলবে? কেউ যদি বলে বিজেপির এই 'হিন্দু তোষণ' বিরোধী দলগুলোর মুসলিম তোষণের পাল্টা রাজনৈতিক চাল, সেও কি খুব ভুল বলবে? দেশের ৮০% ভোটারকে কনফিডেন্সে নিয়ে রাজনীতি করাটাই তো স্বাভাবিক। তবে এটা এতদিন কোনও পার্টি করেনি কেন? কারণ এতদিন হিন্দুরা তাদের ভোটের মূল্য এবং ক্ষমতা বোঝে নি। মুসলমানরা বরাবর মুসলমান হিসেবে ভোট দিয়েছে, হিন্দুরা ভোট দিয়েছে নিজের নিজের পছন্দের পার্টির একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে। সেকুলার ভারতে হিন্দু হিসেবে ভোট দেওয়া যায়, এবং সেই ভোটে সরকার গড়া যায় একথা বাবরি ধ্বংসের আগে হিন্দুরা কোনদিন ভাবতেই পারেনি। সেই ঘটনার পরে কিন্তু হিন্দুদের মনে নিজেদের দেশ নিজেরা শাসন করার একটা আকাঙ্খার জন্ম নিয়েছে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। তাই এই 'হিন্দু তোষণ' অথবা হিন্দুত্ব কেন্দ্রিক রাজনীতি বর্তমান সেকুলার ভারতে সম্ভব হয়েছে কোনও রাজনৈতিক দল অথবা নেতার বদান্যতায় নয়, এটা সম্ভব হয়েছে হিন্দু তার শক্তি সম্পর্কে অবহিত হয়েছে বলে, বিশেষতঃ সে তার ভোটের মূল্য এবং ক্ষমতা - দুটোই বুঝতে পেরেছে বলে।

একদিকে হিন্দু তার ভোটের মূল্য বুঝতে পেরেছে। অপরদিকে মোদি-শাহ'র বিজেপিও হিন্দুদের ভোটের মূল্য কিছুটা হলেও দিয়েছে। প্রতিদানে হিন্দুরাও তাদের বিমুখ করে নি। পরিণামে আজ হিন্দু ব্লকভোট‌ আর বিজেপির সাপোর্ট বেস সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলস্বরূপ কোনঠাসা হয়েছে সেকুলারিজমের নামে মুসলিম তোষণকারী প্রত্যেকটা দল। চাপে পড়ে এখন অনেকের মাথা থেকে ফেজটুপি সরে যাচ্ছে, নেমে যাচ্ছে নীলসাদা হিজাব। সম্প্রতি আমাদের রাজ্যে উদ্বাস্তুদের জন্য জমির পাট্টা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। খুব সম্ভব রাজ্য সরকারের দৃষ্টিতে হিন্দুরাই উদ্বাস্তু। যদি তা ই হয়, তাহলে কি এবার এই রাজ্যেও 'হিন্দু তোষণ' পর্ব শুরু হতে চলেছে? অসম্ভব কিছু নয়।

১৫-২০% বাম ভোটের সাথে গোটা ১৫% মুসলিম ভোট তৃণমূলের থেকে বেরিয়ে গিয়ে জোট বাঁধার যে ভয় দেখিয়ে রাজ্যের মুসলমানরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্ল্যাকমেল করছিল, বামেদের ভোট কমে গিয়ে ৭% এ ঠেকায় এখন সেটা আর করা সম্ভব হচ্ছে না। সুতরাং মমতা ব্যানার্জির মুসলিম তোষণের কম্পালশন আর বিশেষ নেই। তাই এখন ওয়েসি-র মিম পার্টিকে এনে তৃণমূলের মুসলিম ভোট কাটার ভয় দেখিয়ে মমতাকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছে মুসলমানেরা। কিন্তু মুসলমানরা কি তৃণমূলের ভোট কেটে বিজেপির সুবিধা করে দিতে চাইবে? তারা এটা করবে বলে আমার মনে হয় না। তাহলে নিজেদের বাঁচার তাগিদে তৃণমূলকে বাঁচিয়ে রাখার কম্পালশন এখন কাদের? মমতা ব্যানার্জি এখন মুসলমানদের কেবল বিজেপির জুজু দেখিয়েই শান্ত করে রাখবেন। আমি বিশ্বাস করি মমতা ব্যানার্জি যা করেন, নিজে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই করেন।

এদিকে মিমের প্রচারে যে হিন্দু কনসলিডেশন তৈরি হবে, তাকে ভাঙার জন্য মমতা ব্যানার্জিকে হিন্দুর জন্য হাত খুলতেই হবে। ইতিমধ্যেই তার কিছু কিছু ইঙ্গিত‌ও পাওয়া যাচ্ছে। মাথার হিজাব তো নেমে গেছেই, সাথে সাথে পূজার ভোগ রান্না করার ভিডিও বের করা হচ্ছে। উদ্বাস্তুদের জন্য জমির পাট্টা দেওয়ার ঘোষণাও অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। তবে নাগরিকত্ব বিল পাশ হলে মমতার উপরে চাপ আরও বাড়বে। আমার ধারণা তৃণমূল উদ্বাস্তু হিন্দুদের ভোটের কথা মাথায় রেখে এই নাগরিকত্ব বিল পাশ করাতে পরোক্ষভাবে কেন্দ্রীয় সরকারকে সহযোগিতাই করবে। 

হিন্দু ভোট যত কনসলিডেট হবে, হিন্দু তোষণের প্রতিযোগিতা তত বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে লাখ টাকার প্রশ্ন থেকেই গেল - রাজ্যের রাজনীতিতে ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হতে থাকা মুসলিম ভোটের লোভে পড়ে রাজ্য বিজেপি নিজেদের পায়ে, সাথে সাথে পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালী হিন্দুর পায়ে কুড়াল মারবে না তো? বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব এই সংগঠিত হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে taken for granted মনে করছে না তো!

Thursday, November 21, 2019

মেরুদণ্ডহীনতায় লজ্জিত হ‌ওয়ায় লজ্জা কিসের?

আজকের দিন, ২২শে নভেম্বর। সালটা ২০০৭। কলকাতার বুকে লুঙ্গি-টুপির তাণ্ডব চলছে। তসলিমাকে তাড়াতে হবে এই রাজ্য থেকে। কেন? উনি একটা ব‌ই লিখেছেন। নাম 'লজ্জা'। সেই ব‌ইয়ে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের একটা চিত্র তুলে ধরেছেন সাহসী তসলিমা। বাংলাদেশে প্রাণ সংশয়। তাই আশ্রয় নিয়েছেন প্রোগ্রেসিভ, লিবেরাল বাঙালির বাসস্থান এই কলকাতায়। হ্যাঁ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, কবি সৃজাত, শীর্ষেন্দু, গরুখেকো সুবোধ-বিকাশ কবীর সুমনদের কলকাতায়।

লুঙ্গি-টুপির তাণ্ডব চলছে তসলিমাকে তাড়াতে হবে। দুদিন ধরে বিনা বাধায়। নেতৃত্বে জনপ্রতিনিধি ইদ্রিস আলী। না, এর প্রতিবাদে একটাও মিছিল, যার সামনের সারিতে অপর্ণা সেন, সুবোধ বিকাশ - এই কলকাতার বুকে হয় নি। একটাও কবিতা সৃজাতদের কলম থেকে বেরোয় নি। দুদিন ধরে চলল এই তাণ্ডব। অবশেষে সকলের অসহায় আত্মসমর্পণ মুসলিম মৌলবাদের সামনে। তাড়ানো হল তসলিমাকে।

বুদ্ধিজীবীদের এই নীরবতা কি কলকাতার বাঙালির লজ্জা নয়? মরীচঝাঁপির ক্ষেত্রে আনকম্প্রোমাইজিং অবস্থান নেওয়া প্রবল প্রতাপশালী লাল সরকারের মুসলিম মৌলবাদীদের সামনে এই অসহায় আত্মসমর্পণ কি বামপন্থীদের লজ্জা নয়? 

না, এগুলো ওদের লজ্জিত করে না। কারণ এই পক্ষপাতমূলক আচরণটাই ওদের নীতি। কারণ এরা ওদের পক্ষে। মুক্তচিন্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা - এইসব তত্ত্বের অবতারণা তখনই হবে যখন আপনি এই মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। এই সব তত্ত্ব বামৈস্লামিক দুষ্কৃতীদের প্রতিক্রিয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অন্যতম অস্ত্র। এই সব‌ই আপনাকে আমাকে থামানোর জন্য।

এটা আসলে আমাদের‌ই লজ্জা। কারণ আমরা এই বামৈস্লামিক ষড়যন্ত্রের হাত থেকে তসলিমাকে বাঁচাতে পারিনি। কারণ আমরা আজও এই ভারতবিরোধী, হিন্দুবিরোধী বামৈস্লামিক শক্তিকে ভারতের মাটি থেকে শিকড়সমেত উপড়ে ফেলতে পারিনি। তাই যতদিন বামৈস্লামিক দুষ্কৃতীদের শিকার তসলিমাদের নিরাপত্তা দিতে না পারবেন, এদের ধ্বংস করে প্রকৃত মুক্তচিন্তার প্রতিষ্ঠা না করতে পারবেন, আসুন লজ্জিত হ‌ই। মেরুদণ্ডহীনতায় লজ্জিত হ‌ওয়ায় লজ্জা কিসের?