Monday, September 30, 2019

পশ্চিমবঙ্গের ভূমিপুত্র এবং তাদের অধিকার

পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালি হিন্দুরা, যারা ভারতের মাটিকে মাতৃসম মনে করেন, তারাই পশ্চিমবঙ্গের ভূমিপুত্র।

পশ্চিমবঙ্গের বাইরে, ভারতের অন্য রাজ্য কিংবা পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে বসবাসরত একজন বাঙালি হিন্দু এরাজ্যে ফিরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাইলে তিনি সর্বদা স্বাগত এবং ভূমিপুত্রের মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী।

২০শে জুন ১৯৪৭-এ বঙ্গীয় আইন পরিষদের ভোটাভুটিতে একজন মুসলমান‌ও পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে ভোট দেয় নি। সবাই চেয়েছিল সম্পূর্ণ বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাক।

এমনকি ১৯৪৬ এর সাধারণ নির্বাচন, যাতে মুসলিম লীগের মূল ইস্যু ছিল পাকিস্তান, সেই নির্বাচনে বাংলার মুসলমানেরা উজাড় করে লীগকে ভোট দিয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় সব মুসলমান চেয়েছিল যে সম্পূর্ণ বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হোক। তাদের সমর্থনের ফলেই এই নির্বাচনে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত সিটের ৯৫% লীগের পক্ষে যায়।

ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত বঙ্গের এক তৃতীয়াংশ ভুমি এই পশ্চিমবঙ্গ যে হিন্দুদের হোমল্যান্ড এবং বাঙালি হিন্দুরা যে এখানকার ভূমিপুত্র সে বিষয়ে এরপরেও কোনও সন্দেহ আছে?

ভারত উপমহাদেশে যে সংস্কৃতির জন্ম এবং ক্রমবিকাশ হয়েছে, তার অন্যতম মূল তত্ত্ব হল Live and let live. বহিরাগত আব্রাহামিক ভাবধারার মূলতত্ত্ব এই মাটিতে বিকশিত Live and let live সংস্কৃতির পরিপন্থী। তাই এই অসহিষ্ণু আব্রাহামিক ভাবধারায় যারা বিশ্বাস করে, তারা কিভাবে এই মাটির ভূমিপুত্র হতে পারে?

কেউ ভারতের নাগরিক হলেই কিন্তু সে এরাজ্যের ভূমিপুত্র হতে পারে না। ভূমিপুত্র একটা বিশেষ 'স্টেটাস'। সবাই ভারতের নাগরিক হলেও, ভারতের একতা ও অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও বিহারে একজন বিহারীর যে স্টেটাস, মহারাষ্ট্রে মারাঠির যে স্টেটাস, তামিলনাড়ুতে একজন তামিলের যে স্টেটাস, গুজরাটে একজন গুজরাটির যে স্টেটাস, আসামে একজন অহমীয়ার যে স্টেটাস, নাগাল্যান্ডে একজন নাগার যে স্টেটাস, পশ্চিমবঙ্গে একজন হিন্দু বাঙালির সেই একই স্টেটাস প্রাপ্য। এই অধিকার থেকে কেউ আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না।

পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত তফশিলি উপজাতির অন্তর্ভুক্ত বন্ধুরাও এখানকার ভূমিপুত্র বলে আমি মনে করি।

এছাড়াও যে সমস্ত অবাঙালি হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈনদের জন্ম পশ্চিমবঙ্গে অথবা দীর্ঘ  সময় ধরে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, তাদের মধ্যে যারা নিজেদের আইডেন্টিটি বজায় রেখেও এখানকার ভূমিপুত্র হিন্দু বাঙালি সমাজ, আদিবাসী সমাজ এবং তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল; তারা চাইলে তাদের সাথে এই ভূমিপুত্রের স্টেটাস ভাগাভাগি করে নিতে আমাদের কোনও আপত্তি থাকা উচিত নয় বলে আমি মনে করি।

মনে রাখতে হবে, ভারতের দশটা রাজ্যকে এবং রাজ্যের ভূমিপুত্রদের ৩৭১ ধারার মাধ্যমে বিশেষ স্টেটাস দেওয়া হয়েছে। আন্দামান এবং নিকোবর দীপপুঞ্জের ভূমিপুত্রদের 'আইল্যান্ডার কার্ড' এর মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাই এই ভূমিপুত্রের লীগ্যাল স্টেটাসের কল্পনা মোটেই অলীক নয়। এর বাস্তবায়ন সম্ভব কিন্তু তার জন্য অনেক মূল্য দিতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের এই বাঙালি হিন্দু জাতীয়চেতনা কি বৃহত্তর হিন্দু অবধারণার পরিপন্থী?

আপনি আর আমি যখন এক জায়গায় আসি তখন কি নিজের ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে এক জায়গায় আসতে হয়? কয়েকজন ব্যক্তি নিয়ে যখন একটা পরিবার তৈরি হয়, তখন সেই পরিবারের সব ব্যক্তিকে তাদের ব্যক্তিসত্ত্বাকে বিসর্জন দিতে হয়? বরং যে ব‍্যক্তি বেশী প্রতিষ্ঠা অর্জন করে, পরিবারে তার গুরুত্ব বেশী থাকে, সে একজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে আলাদা সম্মান পায়। তাহলে বৃহত্তর হিন্দু সমাজের অঙ্গ হতে হলে, সেখানে ভ্যালু অ্যাড করতে হলে বাঙালিকে তার জাতীয় পরিচয় বিলোপ করতে হবে কেন? কেন আমরা বৃহত্তর হিন্দু সমাজের গুরুত্বপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে বাঙালি সমাজকে তৈরি করবো না? বাঙালির মাটি গেছে, মানুষ গেছে, আত্মসম্মান তলানিতে। সরকার এন‌আরসি আর ক‍্যাব করে দিলেই আমরা সন্তুষ্ট! এটাও যে আমাদের ডিমান্ডের জন্য হচ্ছে তাও তো নয়! অহমীয়া আন্দোলনের চাপে এই এন‌আরসি। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দু ফোর্জ ডকুমেন্ট তৈরি করিয়ে লুকিয়ে ভারতে থাকা পছন্দ করেছে, কিন্তু নিজদের নাগরিকত্বের দাবিতে মরণপণ আন্দোলন করেনি। এই অচেতন, পরনির্ভরশীল জাতিকে আত্মনির্ভর এবং স্বাভিমান সম্পন্ন হতে হলে নিজের জাতীয়চেতনাকে জাগাতেই হবে।

।।এ মাটি আমার মাটি, মাটির দখল ছাড়ছি না।।

Wednesday, September 11, 2019

ওরা পারে, কিন্তু আমরা পারি না

যৌক্তিকতা অথবা ঔচিত্যের প্রশ্নটা আলাদা। প্রশ্নটা হচ্ছে ওরা অস্ত্র মিছিল করছে, প্রশাসন নীরব। আমরা করলে প্রশাসন সক্রিয়। ওরা প্রতি সপ্তাহে রাস্তা বন্ধ করে নামাজ পড়ছে, আমরা বছরে এক দুবার রাস্তায় পূজোপাঠ করলে প্রশাসন বিভিন্ন ফরমান জারি করছে। ওরা মসজিদে দিনে পাঁচবার মাইক বাজাচ্ছে, আমরা বাজাতে চাইলে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। আইনের শাসন শুধুমাত্র আমাদের উপরে, ওদের জন্য কনসেশন। আসলে কনসেশন নয়, এটা কম্প্রোমাইজ। সবক্ষেত্রে চূড়ান্ত কম্প্রোমাইজ। মাদানী সাহেব আসামে দাঙ্গা করার হুমকি দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকেন, দেবতনু ভট্টাচার্য আত্মরক্ষার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিতে আহ্বান করলে তার বিরুদ্ধে ১৫৩-র এ ধারায় ২৭টি মামলা হয়। ওরা পাকিস্তানের পতাকা তুলতে পারে, জাতীয় সঙ্গীত চলাকালীন সিটে বসে থেকে জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননা করতে পারে, সোস্যাল মিডিয়ায় হিন্দু দেবদেবীর অপমান করতে পারে, দেশের আইন না মানার ঘোষণা প্রকাশ্যে করতে পারে। অন্যায় হলেও পারে। এদিকে আমরা নিজেদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে বলে ক্ষীণ স্বরে চিৎকার করতে পারি, কিন্তু অধিকার আদায় করে নিতে পারি না। ওরা অন্যায় করছে বলে কিছুটা ভয়ে ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে তার প্রতিবাদ করতে পারি কিন্তু শেষমেশ ওদের থামাতে পারি না।

ওরা যেটা চায়, সেটা ন্যায়সঙ্গত না হলেও ওরা করতে পারে। আমরা ন্যায্য অধিকারও আদায় করতে পারি না। কেন?

প্রথমত, আমাদের মধ্যে আমাদের 'সামাজিক পরিচয়'-এর বোধ নেই। সমাজ হিসেবে 'আমরা' কারা? সমাজ হিসেবে আমাদের ইতিহাস কি? সমাজ হিসেবে আমাদের জয় এবং পরাজয়ের ঘটনাগুলো কি? সমাজ হিসেবে আমাদের সুখ ও দুঃখের ঘটনাগুলো কি? কোন্ কোন্ ঘটনায় সমাজ হিসেবে আমাদের লাভ হয়েছে? আবার কোন্ কোন্ ঘটনায় সমাজ হিসেবে আমাদের ক্ষতি হয়েছে? সমাজ হিসেবে আমাদের চোখে হিরো কে আর ভিলেন‌ই বা কে? শত্রু কে? মিত্র‌ই বা কে? গৌরবের চিহ্ন কোনগুলো? অপমানের চিহ্ন‌ই বা কোনগুলো? আমাদের কিসে ভালো আর কিসে খারাপ - এই সমস্ত বিষয়ে সমাজ হিসেবে আমাদের 'সামাজিক ঐক্যমত' আছে? নেই। থাকলে বাঙালি হিন্দুদের এই করুণ অবস্থা হতো না। কিন্তু এই 'সামাজিক ঐক্যমত' ওদের আছে। তাই ওরা পারে, আমরা পারি না।

দ্বিতীয়ত, সমাজবোধ না থাকলে একটা সমাজের জনসংখ্যা থাকতে পারে কিন্তু জনবল থাকে না। জনবল না থাকলে শেষ পর্যন্ত জনসংখ্যাটাও ধরে রাখা যায় না, অবক্ষয় হতে হতে একদিন বিনাশ হয়। সমাজবোধ হল সমাজের প্রাণ। সমাজবোধ না থাকায় বাঙালি হিন্দু আজকে প্রায় প্রাণহীন শরীরে পরিণত হয়েছে। আমাদের জনসংখ্যা আছে, জনবল নেই। ওদের জনসংখ্যাটাই জনবল, যেটা ক্রমাগত বাড়ছে। তাই ওরা পারে, আমরা পারি না।

তৃতীয়ত, নিজের সমাজের উত্থানের জন্য, অধিকার আদায় করে নেওয়ার জন্য মূল্য দিতে হয়, সমর্পণ করতে হয়। সময় দিতে হয়, অর্থ দিতে হয়, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বিদ্যা, বুদ্ধি - সব ঢেলে দিতে হয়,  প্রয়োজনে রক্ত‌ও দিতে হয়। আমরা কি প্রস্তুত? ওরা জাকাত দেয়, ওরা জেহাদের টানে আত্মাহুতি দেয়, কেস খায়, জেল খাটে। তাই ওরা পারে, আমরা পারি না।

চতুর্থত, সমাজের 'Collective will' যাতে সমাজ জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয় তার জন্য সক্রিয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঠিক পরিচালনার জন্য পরিচালন সমিতিতে, মন্দির কমিটি, হাট/ বাজার কমিটি, পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে লোকসভা পর্যন্ত সমস্ত ক্ষেত্রে সঠিক প্রতিনিধিত্ব পাঠানোর জন্য ইতিবাচক ভূমিকা নিতে হবে। 'রাজনীতি পছন্দ করি না' গোছের ন্যাকামো করলে চলবে না। এটা সামাজিক দায়িত্ব। জনপ্রতিনিধিরা তার কাজ সঠিকভাবে না করলে সামাজিক আন্দোলন করতে হবে, রাস্তায় নামতে হবে। আমাদের কালেক্টিভ উইল ভোটে প্রতিফলিত হয় না, ওদের ভোটে তো হয়‌ই, অন্যান্য সমস্ত ক্ষেত্রেও হয়। তাই ওরা পারে, আমরা পারি না।

সর্বোপরি সমাজকে ঠিক রাখার দায়িত্ব মহাপুরুষদের নয়, সাধারণ মানুষের। যাঁরা ব্যক্তিগত কাজের ব্যস্ততার মধ্য থেকে সময় বার করে সামাজিক দায়িত্ব পালন করেন, তাঁরা মহান নন, তাঁরাই সাধারণ। একটা সমাজ তার সাধারণ সদস্যদের কাছেই এই দায়িত্ববোধ আশা করে। মহান ব্যক্তিত্বরা একটা সমাজের উপরি পাওনা।কিন্তু যারা এই দায়িত্ব এড়িয়ে যান, তারা সাধারণ নন, তারা Below Normal Standard. 'সবাই তো আর মহাপুরুষ হতে পারে না' - এ বড় চালাকির কথা! এই কথা বলে আমাদের সমাজের অধিকাংশ সদস্য তাদের সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। এই চালাকি চলবে না। আমাদের বাঙালি হিন্দু সমাজের মাথায় পচন ধরেছে। আমরা আমাদের নিজেদের সমাজকেই ঠকাই, ওরা নিজেদের সমাজকে ঠকায় না। তাই ওরা পারে, আমরা পারি না।

Sunday, September 8, 2019

এন‌আরসি - র ভিত্তিবর্ষ

এন‌আরসি - র ভিত্তিবর্ষ? ওটা পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য হোক। বাস্তবে দেশভাগের পরে ওদের ভারতে এসে বসবাস করার কোনও নৈতিক অধিকার‌ই নেই। তাই ১৯৪৭ এর ১৪ই আগষ্টের পরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা প্রত্যেক মুসলমান অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। ভুলে গেলে চলবে না অখণ্ড বঙ্গের ৯৩% মুসলমান পাকিস্তানের পক্ষে মুসলিম লীগকে ভোট দিয়েছিল। বস্তুত এদের ভারতে লালন পালন করা মানে পাকিস্তানী কালসাপদের দুধকলা দিয়ে পোষা। এরা যেকোনো সময় ছোবল মারবেই মারবে। সুতরাং ভারতের শত্রুদের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া যাবে না।

পাশাপাশি, হিন্দুদের জন্য কিসের ভিত্তিবর্ষ? হিন্দুরা দেশভাগের আগে থেকে আজ পর্যন্ত ধর্মীয় আগ্রাসনের শিকার। ভবিষ্যতেও হতেই থাকবে। তাই পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তে বসবাসকারী হিন্দু যেকোনো সময়ে ভারতে এসে নাগরিকত্ব চাইলে তাকে স্বাগত জানাতে হবে। বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড এই পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গ জন্ম নিয়েছিল এই উদ্দেশ্যেই। তাই বাঙালি হিন্দুদের জন্য কোনও ভিত্তিবর্ষ করাটা‌ই অযৌক্তিক। এদের অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে নাগরিকত্ব দিতে হবে।

এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যাগুলো কি? সবথেকে বড় সমস্যা হল বাঙালি হিন্দুর মানসিকতা। যারা অত্যাচারিত হয়ে ওপার থেকে আসবেন, তারা ওপারে তাদের উপরে হ‌ওয়া অত্যাচারের কথা এপারে এসে কিছুতেই স্বীকার করবেন না! বরং কিছু লোক সুজন চক্রবর্তীদের ধামাধরে থাকবেন। নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এপারের মানুষকে ইসলামী আগ্রাসনের ব্যাপারে সচেতন করার পরিবর্তে তাদের ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ দেবেন। অনেকে আবার দলিত-মুসলিম ঐক্যের কথা বলে নিজেদের আখের গুছাতে ব্যস্ত থাকবেন। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আপনাদের যেমন অধিকার আছে, একটা দায়িত্ব‌ও তো আছে! এটাতো সত্য যে আপনারা এপারে এসে এপারের জমি, খাদ্য এবং কর্মসংস্থানের উপরে ভাগ বসাচ্ছেন। এটাযে একটা চাপ তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। যেভাবে আসামের অহমীয়ারা প্রতিক্রিয়া করেছে বা করছে, সেভাবে এপারের বাঙালি হিন্দুরা এখনও পর্যন্ত এর বিরোধিতা না করলেও একটা চাপা অসন্তোষ যে আছে, এবং সেটা স্বাভাবিক তা অস্বীকার করা যায় না। 

এর সমাধান কি? সোজা কথায় অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের দখল করা জমি, খাদ্য ও কর্মসংস্থানের জায়গা ছিনিয়ে নিয়ে সেখানে নব্য নাগরিকদের পুনর্বাসন হবে। তাই এন‌আরসি চাই। সঠিকভাবে এবং কঠোরভাবে চাই। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হিন্দু বাঙালিদের সংখ্যার সমানুপাতে বাংলাদেশ থেকে জমি আদায় করতে হবে।

এই লড়াইয়ের পুরোভাগে নব্য নাগরিকদের‌ই থাকতে হবে এবং সম্পূর্ণ বাঙালি জাতিকে এই আন্দোলনে যোগদান করতে হবে। এভাবেই নবকলেবরে জেগে উঠবে বাঙালি জাতি এবং সার্থক হবে পশ্চিমবঙ্গের জন্মের উদ্দেশ্য। আমার বিশ্বাস, এতে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের জায়গাটা অত্যন্ত সুদৃঢ় হবে, যা একটা শক্তিশালী জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য খুবই প্রয়োজন।

অনেকে আসামের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গে এন‌আরসি - র বিরোধিতা করছেন। তাদের অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদে স্টটলেস করার প্রয়োজনীয়তার কথাটা চিন্তা করা দরকার। এরা থেকে গেলে এন‌আরসি আটকে আপনারা যাদের বাঁচাতে চাইছেন, তারাও বাঁচবে না। বাংলাদেশে এন‌আরসি হয় নি, তথাপি হিন্দুরা উদ্বাস্তু হয়েছে। ডোমোগ্রাফিটা একবার পাল্টে গেলে এক‌ইভাবে আমরাও উদ্বাস্তু হবো। তাই গঠনমূলক দৃষ্টিতে এন‌আরসি কে দেখুন। পশ্চিমবঙ্গে এন‌আরসি হতেই হবে, কিন্তু সেটা যাতে আমাদের শর্তেই হয় তারজন্য রাস্তায় নামতেই হবে।

Saturday, August 31, 2019

এন‌আরসি, আসাম এবং বাঙালি হিন্দু

আসামে এন‌আরসি এক কথায় পর্বতের মূষিক প্রসব। বরং এই এন‌আরসি-র ফলশ্রুতিতে বাঙালি হিন্দুদের একটা বিরাট অংশ ( সেটা ৯ লাখ না ১১ লাখ জানিনা) আজ অনিশ্চয়তার সামনে। হিন্দু সংহতি এদের পাশে থাকবে। ভারতে থাকার অধিকার এদের আছে, সেই অধিকার আদায় করার লড়াইয়ে আমরা সাথে ছিলাম, আছি  আর থাকবো।

৩৭০ ধারা রদ হলো। সারা দেশে 'এক নিশান, এক বিধান, এক প্রধান' প্রতিষ্ঠিত হ‌ওয়ার দিকে আমরা একধাপ এগিয়ে গেলাম। আর আজ বিজেপি শাসিত আসামে কেন্দ্রের 'পাসপোর্ট আইন ২০১৫' মূল্যহীন! এই আইনে বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় কারণে বিতাড়িত হিন্দুরা ভারতে আশ্রয় নিলে তাদের ভারতে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সারা ভারত এই আইন মেনে চলবে, আর আসামে তা চলবে না, চলবে 'আসাম চুক্তি'! বিজেপির   কেন্দ্রীয় সরকার প্রণোদিত 'পাসপোর্ট আইন ২০১৫' কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিজেপি শাসিত আসাম রাজ্যে এন‌আরসি-র ভিত্তি আজ কংগ্রেস জমানার সেই 'আসাম চুক্তি'! কেন্দ্রের এই আইনের সুবিধা সারা ভারতের হিন্দু শরণার্থীরা পাবে, কিন্তু আসামের বাঙালি হিন্দু শরণার্থীরা পাবে না!

এই বৈষম্য চলবে না। আমরা আসামের শরণার্থী হিন্দুদের প্রতি এই বৈষম্যমূলক আচরণের তীব্র বিরোধিতা করছি। কেন্দ্রীয় সরকার এবং আসামের রাজ্য সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, একজন শরণার্থী বাঙালি হিন্দুকেও যেন বিদেশী বলে গ্রেফতার অথবা বিতাড়িত করা না হয়। পাশাপাশি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে হিন্দু সংহতি শীঘ্রই সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থে মামলা দায়ের করতে চলেছে।

কিন্তু সব থেকে বড় প্রশ্ন, যে কয়েক লাখ হিন্দুর নাম বাদ গেল, তারা কি করবে? হয় তাদের বৈধ কাগজপত্র দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে তারা বিদেশী নয়। অথবা তাদের মুক্তকন্ঠে স্বীকার করতে হবে যে তারা বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় কারণে বিতাড়িত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। এই লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দু রাস্তায় নামবেন? অন্তত এদের ১০-১৫% লোক? বড় কঠিন প্রশ্ন! রোহিঙ্গাদের দেখছি আর অবাক হচ্ছি। বুক ঠুকে বলে বেড়াচ্ছে, হ্যাঁ আমরা বিতাড়িত। থাকতে দিতে হবে, সুযোগ সুবিধা দিতে হবে, জল দিতে হবে, খাবার দিতে হবে। সবাই দিচ্ছেও ওদের! কতজন ওরা সর্বসাকুল্যে? আর আমরা আসামে কত লক্ষ? ওরা পারছে, আমরা পারছি না কেন?

Wednesday, August 28, 2019

পশ্চিমবঙ্গে জনজাগরণ

পশ্চিমবঙ্গে জনজাগরণ! এর মানে কি? বাঙালির জাগরণ ঘটানোর দরকার আছে? বাঙালি এত যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে কিভাবে? দেশ হারিয়ে উদ্বাস্তু হ‌ওয়ার যন্ত্রণা! প্রিয়জনের নির্মম হত্যা, ধর্ষণের প্রত্যক্ষদর্শী হ‌ওয়ার যন্ত্রণা! শরীরের রক্ত জল করে গড়ে তোলা বাড়ি, ব্যবসা হাতছাড়া হয়ে যা‌ওয়ার যন্ত্রণা! কার‌‌ও দিদি, কার‌ও বোনকে ভাগ করে নিলো ওরা নিজেদের মধ্যে গণিমতের মাল হিসেবে। এদিকে অসহায়, ফ্যালফ্যাল করে পিছনের দিকে তাকাতে তাকাতে কাঁটাতার পেরিয়ে এপারে চলে আসা বাঙালি, বুকে আজও সেই অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে কিভাবে? ওপারে মালাউনের বাচ্চা, এপারে রিফিউজির বাচ্চা তকমা নিয়ে বাঙালি ঘুমায় কিভাবে! ওপারের নোয়াখালী, ভৈরবের চরের রক্তাক্ত পথ ধরে এপারের নলিয়াখালি, দেগঙ্গা, বাদুড়িয়া, ধূলাগড়, বগাখালিতে পৌঁছে বাঙালি আজ ঘুমিয়ে থাকে কিভাবে! আমি বিশ্বাস করি না বাঙালি ঘুমিয়ে আছে। তাই তাকে জাগানোর চেষ্টা করোর কোনও প্রয়োজন নেই। বাঙালি প্রতি মুহূর্তে চিৎকার করে তার যন্ত্রণাকে ব্যক্ত করতে চায়। কিন্তু তার কথা শোনে কে? সেকুলারিজম আর লিবারালিজমের ভন্ডামির ঢাকের আওয়াজে বাঙালির এই চিৎকার চাপা পড়ে আছে আজও। তাই প্রশ্ন হলো আজ কে কাকে জাগাবে? যারা জনজাগরণ করতে চাইছে তারা নিজেরাই আগে জাগ্রত হয়ে কান পাতুক বাঙালির মনের মণিকোঠায়। জানার চেষ্টা করুক বাঙালির সামনে প্রায়োরিটি কি - রাজ্যব্যাপী অসংখ্য স্থানে মগরাহাটের সেলিম, জীবনতলার সৌকত মোল্লা, সরবেড়িয়ার সাজাহান শেখ, হাসনাবাদের বাবু মাস্টার, কীর্ণাহারের মনিরুল, ভাঙ্গড়ের আরাবুল-কাইজার, মিনাখাঁর আয়ুব গাজীদের পরিচালিত সমান্তরাল জেহাদী শাসনের অবসান, নাকি ইলেকট্রিক বিলের খরচা কমানো।

Tuesday, August 27, 2019

বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব সুনিশ্চিত না করে পশ্চিমবঙ্গে এন‌আরসি করার চেষ্টা হলে তার তীব্র বিরোধিতা করা হবে

আসামে ‌এন‌আরসি-র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হতে চলেছে ৩১শে আগষ্ট। এই তালিকা অনুযায়ী যাঁঁরা বিদেশী বলে ঘোষিত হবেন, সরকার তাঁঁদের আশ্বস্ত করেছে যে তাঁঁরা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থী বাঙালি হিন্দুদের, যাঁঁরা ৭১এর পরে ভারতে এসেছেন, তাঁঁদের জন্য কি ধরণের সুরক্ষা কবচ থাকছে সে সম্পর্কে আমার এখনও কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। কারণ নাগরিকত্ব আইন এখনও প্রণয়ন করা সম্ভব হয় নি, আর আগের টার্মে মোদি সরকার যে নোটিফিকেশন জারি করে সাময়িক ভাবে উদ্বাস্তু হিন্দু বাঙালিদের একটা সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল, সেটাও এখন বলবৎ আছে কি না জানি না। অবশ্য এই নোটিফিকেশন আসামে কতটা কার্যকরী ছিল, সেটাও একটা বড় জিজ্ঞাসা। তাই শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে সেটা এখন কেউ সঠিকভাবে বলতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে ৩৭০ ধারা বিলোপকারী এই কেন্দ্রীয় সরকারের যে একটা সদিচ্ছা আছে এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। বস্তুতঃ একমাত্র এই সদিচ্ছাই এখন আসামের বাঙালি হিন্দুর সব থেকে বড় ভরসা। এখন মোদি-শাহ্ যদি সর্বোচ্চ আদালতের কোর্টে বল ঠেলে দেন, সেটা হবে বাঙালি হিন্দুর ইতিহাসে সবথেকে বড় বিশ্বাসঘাতকতা।

আসামের উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দুর কি হতে চলেছে সেটা সময় বলবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গেও তো এন‌আরসি হ‌ওয়া দরকার। আমরা প্রথম থেকেই বলে এসেছি জাতীয় স্বার্থে এন‌আরসি চাই। ভারতবর্ষ সরাইখানা নয়। রাজ্য থেকে অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের তাড়াতে হবেই। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে এই অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলে‌। ১৯৪৭ এর ২০শে জুন প্রস্তাবিত পাকিস্তানের বুক চিরে এই পশ্চিমবঙ্গের জন্ম‌ই হয়েছিল বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড হিসেবে। কিন্তু আমরা দেখছি দেশভাগের পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত উদ্বাস্তু হিন্দু জনস্রোতকে টেক্কা দিয়ে লাগাতার অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে আমাদের রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গের তিনটি জেলায় ইতিমধ্যেই বাঙালি হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে।  এক‌ই চিত্র বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন বেশিরভাগ ব্লকে। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি চরিত্র বজায় রাখতে হলে অবিলম্বে এন‌আরসি শুরু করা আবশ্যক। কিন্তু আমরা ঘর পোড়া গরু। আসামে উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দুরা যে অনিশ্চয়তার সামনে পড়েছে, আমাদের রাজ্যে যাতে তা না হয়, তারজন্য ভাবত হবে বৈকি! তাই  আমরা মনে করি বাংলাদেশ থেকে যে অত্যাচারিত বাঙালি হিন্দুরা শরণার্থী হিসেবে এই পশ্চিমবঙ্গে আসতে বাধ্য হয়েছে, তাদের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টাকে প্রাথমিকতা দিতে হবে।

আমাদের স্পষ্ট দাবি - প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে আগত শরণার্থী বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব সুনিশ্চিত করতে হবে। তারপরে এন‌আরসি শুরু করতে হবে। তা না হলে বাঙালি হিন্দুরা ব্যাপক অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা শুধুমাত্র মৌখিকভাবে দিলে হবে না। আগে নাগরিকত্ব আইন পাশ করাতে হবে, তারপরে এন‌আরসি। নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন না করে পশ্চিমবঙ্গে এন‌আরসি চালু করার চেষ্টা করলে হিন্দু সংহতি তার তীব্র বিরোধিতা করবে।

Wednesday, August 14, 2019

হিন্দু সংহতি প্রযোজিত তথ্যচিত্র

১৯৪৬ এর ১৬ই আগষ্ট আমার  জাতিসত্তাকে খুন করার দিন। বিশ্বাসঘাতক মুসলিম লীগের হিন্দু গণহত্যার দিন। কল্লোলিনী তিলোত্তমা কলকাতাকে সনাতনী রক্তের নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার দিন। আবার ১৯৪৬ এর ১৬ই আগষ্ট আমাকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রেরণাও দেয়। আত্মবিস্মৃত বাঙলার হিন্দু সমাজকে নতুন করে জিহাদী অত্যাচারের ইতিহাসের সামনে বার বার দাঁড় করিয়ে দেওয়ার জন্যই হিন্দু সংহতির জন্ম। হিন্দু সংহতির জন্ম নতুন ইতিহাস গড়ার জন্যও। অবশ্যই দেখুন ও শেয়ার করুন
হিন্দু সংহতি মিডিয়া প্রোযোজিত
ডকুমেন্টারি,
" রক্ত শোধের দিন, ১৬ই আগষ্ট।"